কার্গিল বিজয় দিবসের শিক্ষা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার গ্লানি: ভারতের অজেয় হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ

প্রতি বছর ২৬ জুলাই দিনটি আসমুদ্র হিমাচলের মানুষের হৃদয়ে গর্ব ও আবেগের এক সংমিশ্রণ হয়ে ফিরে আসে। ১৯৯৯ সালের এই দিনে বরফে মোড়া কার্গিলের দুর্গম শৃঙ্গে শত্রুর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তেরঙ্গা উড়িয়েছিলেন ভারতের অকুতোভয় জওয়ানরা। তবে কার্গিল বিজয় দিবস কেবল বীরত্বের আখ্যান নয়, এটি মাতৃভূমির অখণ্ডতা রক্ষার লড়াইয়ে ৫২৭ জন অমর জওয়ানের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের শোকাবহ স্মারকও বটে। তাঁদের বলিদান আজও ভারতবাসীকে শ্রদ্ধায় অবনত করে।

বিজ্ঞাপন

কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানের মতো এক অবিশ্বস্ত প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে আগাম গোয়েন্দা তথ্যের অভাব ও যথাযথ সতর্কতার গাফিলতি ভারতকে চরম মূল্য চোকাতে বাধ্য করেছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর লাহোর সফরের শান্তির বার্তার আড়ালে পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মুশারফ যে বিশ্বাসঘাতকতার ছক কষেছিলেন, তা ছিল যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। লাহোর ঘোষণার পর ভারতের সামরিক ও অসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাকিস্তানকে অতিরিক্ত বিশ্বাসের চোখে দেখায় সীমান্ত প্রহরায় শৈথিল্য দেখা দেয়, যার ফলশ্রুতিতে শত্রুসেনা সহজে অনুপ্রবেশের সুযোগ পায়।

দ্রাস, মুশকোহ ও বাটালিকের উচ্চতম যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত পাকিস্তানি সেনাদের থেকে উদ্ধার হওয়া নথিপত্রে স্পষ্ট, মার্চ মাসের ১ তারিখেই পাকিস্তানের ‘নর্দান লাইট ইনফ্যান্ট্রি’ সীমান্ত অতিক্রম করেছিল। অথচ ভারত সেই অনুপ্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করতে মে মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো ছিল, কিন্তু ‘ভারত-পাকিস্তান ভাই ভাই’ নামক কূটনৈতিক আবহে সেগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল কাগজে-কলমে টহলদারিতেই সীমাবদ্ধ ছিল দেশের সীমান্ত সুরক্ষার ব্যবস্থাপনা।

গত ২৭ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গোয়েন্দা ব্যবস্থায় দুর্বলতা এবং প্রযুক্তিগত তথ্যের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা ভারতকে বারবার সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আইসি-৮১৪ বিমান অপহরণ থেকে শুরু করে ২৬/১১ মুম্বই হামলা, কিংবা সাম্প্রতিক উরি ও পুলওয়ামার মতো জঙ্গি হামলার ঘটনাগুলো গোয়েন্দা ব্যর্থতারই করুণ প্রতিফলন। প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতকে বিপুল সামরিক ব্যয় ও মূল্যবান প্রাণহানির মতো চড়া মাশুল গুনতে হয়েছে। ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র বা এস-৪০০-এর মতো অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের পেছনে বরাদ্দকৃত বিপুল অর্থ ও মানবসম্পদের যে অপচয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ালে এড়ানো সম্ভব হতো।

বিজ্ঞাপন

ভারতর প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত হওয়া সত্ত্বেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আমলাতান্ত্রিক গণ্ডি ও ঝুঁকিহীন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কেবল সরকারি দপ্তরে রিপোর্ট তৈরিতে সময় ব্যয় না করে, বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণ—যেমন চিনা সামরিক উচ্চপদস্থদের বরখাস্ত কিংবা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সামরিক কৌশলের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সঠিক ও দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। দেশ যখন পরাশক্তির মর্যাদায় আসীন হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন কেবল নৈতিকতার মানদণ্ডে আটকে না থেকে শত্রুর উৎসস্থলে গিয়ে হুমকি নির্মূল করার মতো সাহসী ও স্বাধীন কৌশল অবলম্বন করা এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে, কার্গিল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত গোয়েন্দা ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি দেশকে প্রতিনিয়ত যে মাশুল দিতে বাধ্য করছে, তা থেকে উত্তরণের উপায় কেবল মেধা, উদ্ভাবন ও স্বাধীন গোয়েন্দা ক্ষমতার সমন্বয়। ভারত সরকার ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা যদি পুরনো ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে না পারে, তবে তা হবে দেশের জন্য এক বিরাট দুর্ভাগ্য। শত্রুপক্ষ যতক্ষণ না ভারতের প্রকৃত শক্তিমত্তা ও কৌশলের কাছে ভীত হবে, ততক্ষণ প্রকৃত পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ভারতের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।

তথ্যসূত্র: হিন্দুস্থান টাইমস

0%
0%
0%
0%