তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার আবেদন অরূপ বিশ্বাসের রাজনৈতিক অস্থিরতা তুঙ্গে

রাজ্য রাজনীতিতে বেনজির অস্থিরতার আবহে এবার তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বা স্থগিত করার আবেদন জানিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। নিজেকে দলের ‘কোষাধ্যক্ষ’ দাবি করে তিনি কলকাতার একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের ব্যবস্থাপককে চিঠি দিয়েছেন। বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর দলের অন্দরে চরম সংঘাতের প্রেক্ষিতে অরূপের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক মহলে গভীর উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। গত ১৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত অরূপ বিশ্বাসের এই ভূমিকা কি নেত্রীকে চাপে ফেলার কৌশল, তা নিয়ে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।
গত ১২ জুন পাঠানো ওই চিঠিতে অরূপ বিশ্বাস দলের অভ্যন্তরে চরম বিবাদের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, বর্তমানে দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের দাবি করছে, যার ফলে আর্থিক লেনদেনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দলীয় তহবিলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং অননুমোদিত ব্যক্তির লেনদেন আটকাতেই এই পদক্ষেপ বলে তিনি দাবি করেছেন। সংসদীয় ও পরিষদীয় দলে ভাঙনের প্রসঙ্গ টেনে অরূপ জানিয়েছেন, কর্তৃত্বের বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যেন অ্যাকাউন্টে কোনো লেনদেন না করা হয়। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃণমূলের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৬৭৫ কোটি টাকা জমা রয়েছে।
যদিও ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ অরূপ বিশ্বাসের এই অনুরোধে কোনো মান্যতা দিচ্ছে না। দলীয় সূত্রে খবর, গত ৫ জুন যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অরূপ বিশ্বাসের পরিবর্তে শুভাশিস চক্রবর্তীকে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ বর্তমান কোষাধ্যক্ষের নির্দেশের বাইরে কোনো পদক্ষেপ করতে অস্বীকার করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অরূপের অগোচরেই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন, যা অরূপের প্রভাবকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব সামলানো অরূপ বিশ্বাস সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু বিতর্কিত ঘটনায় অনেকটাই অন্তরালে চলে গিয়েছেন। বিশেষ করে ‘মেসি’ কাণ্ডে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। কালীঘাটে দলের একাধিক বৈঠকে তাঁর অনুপস্থিতি এবং নেত্রীর সাথে মতবিরোধের জল্পনা রাজনৈতিক অন্দরমহলে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। এমনকি অরূপ বিশ্বাস ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ রাখছেন কি না, তা নিয়েও দলের ভেতরে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল।
বর্তমানে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় তলব এড়িয়ে চলা অরূপ বিশ্বাস এখন একাধারে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে এবং দলীয় কোণঠাসার শিকার। এদিকে কলকাতা হাইকোর্ট ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে নতুন করে আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে দলের ভেতরের ভাঙন, কোটি টাকার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আইনি টানাপোড়েন এবং মেসিকাণ্ডের আইনি জালে অরূপ বিশ্বাসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্থান টাইমস
