মহররমের চাঁদ ওঠার সাথে সাথেই ইরানজুড়ে শোকের কালো চাদরে ঢেকে গেছে তেহরানসহ দেশটির প্রতিটি জনপদ। গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার পালিত হয়েছে তাসুয়া ও আশুরা, যা বিশ্বজুড়ে শিয়া মুসলমানদের কাছে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে পরিচিত। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে আশুরা কেবল ধর্মীয় আচারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বর্তমানে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির এক শক্তিশালী মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বয়ানে ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগকে বর্তমান সময়ের ‘প্রতিরোধের অক্ষের’ সাথে মেলানো হচ্ছে। তেহরান সমর্থিত ও শিয়া মতাদর্শী যেসব সামরিক নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধে নিহত হয়েছেন, তাঁদের ইমাম হোসাইনের অনুসারী ও শহীদ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এমনকি নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকেও রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে ‘সৈয়দ-ওল-শোহাদা’ বা ‘শহীদদের নেতা’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে, যে উপাধিটি ঐতিহাসিকভাবে ইমাম হোসাইনের জন্য নির্ধারিত।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে তেহরানে নিহত হওয়ার চার মাস পর, জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ইমাম রেজার পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হবে। এই দাফনকে কেন্দ্র করে ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি পালিত হবে এবং এরপরও দীর্ঘ সময়জুড়ে শহরগুলোতে শোকের আবহের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তেহরানের এঙ্গেলব স্কয়ারসহ দেশটির বড় বড় মোড়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছে শোকের তাঁবু ও প্রচার কেন্দ্র। এসব স্থানে লাউড স্পিকারে বাজছে ধর্মীয় সংগীত এবং নিহত কর্মকর্তাদের ছবি সম্বলিত ব্যানার প্রদর্শন করা হচ্ছে। যদিও রাষ্ট্রীয় এই আয়োজনগুলো শোরগোলে মুখরিত, তবুও সাধারণ ইরানিদের মধ্যে অনেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজস্ব পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারায় শোক পালন করছেন। পশ্চিমাঞ্চলীয় তেহরানের এক তরুণী জানান, বংশপরম্পরায় চলে আসা রীতি অনুযায়ী তাঁরা বাড়িতে বিশেষ খাবার তৈরি করে প্রতিবেশীদের মাঝে বিলিয়েছেন, যা তাঁদের প্রয়াত দাদাকে স্মরণ করার একটি মাধ্যম।
অন্যদিকে, জানুয়ারি মাসে দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় নিহতদের পরিবারগুলো এই শোকের দিনটিকে তাদের স্বজনদের স্মরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ইসফাহান ও আমোলের মতো শহরে অনেক মা তাদের নিহত সন্তানদের ছবি বুকে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে অংশ নিচ্ছেন। উল্লেখ্য, জানুয়ারির ৮ ও ৯ তারিখের উত্তাল রাতে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার সময় হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জাতীয় ঐক্য ও যুদ্ধের মানসিকতা ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মাজার প্রাঙ্গণে প্রদত্ত এক ভাষণে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যেকোনো ধরনের সমালোচনা বা বিভেদ সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড শত্রুর পক্ষেই কাজ করে, এমনকি সেই সমালোচনা যৌক্তিক হলেও। একদিকে ওয়াশিংটনের সাথে সমঝোতার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জনরোষের আশঙ্কায় জর্জরিত ইরানি কর্তৃপক্ষ এবারের আশুরাকে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার কৌশল হিসেবেই ব্যবহার করছে।