AdvertisementAdvertisement

আফ্রিকার নতুন প্রতীকে পরিণত ইব্রাহিম ত্রাওরে: বুর্কিনা ফাসোর শাসন ও নিরাপত্তার সংকট ঘিরে সংশয়

আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের দেশ বুরকিনা ফাসোর বর্তমান শাসক ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে মহাদেশটির রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী ও আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। ২০২২ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা ৩৮ বছর বয়সী এই সেনা কর্মকর্তা বর্তমানে সার্বভৌমত্ব এবং বিদেশি প্রভাবমুক্ত রাজনীতির এক প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার এই বলিষ্ঠ অবস্থান আফ্রিকাজুড়ে জনপ্রিয়তা পেলেও নিজ দেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা সংকট এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা তার শাসনকালকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ক্ষমতায় আসার পরপরই ইব্রাহিম ত্রাওরে ফরাসি সেনাদের বহিষ্কার, রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক উন্নয়ন এবং স্থানীয় কৃষি ও শিল্প খাতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেন। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতার বিরুদ্ধে জনসাধারণের যে ক্ষোভ, ত্রাওরে তা নিজের রাজনৈতিক ইশতেহারের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছেন। সমর্থকদের মতে, তিনি বুরকিনা ফাসোর হারানো জাতীয় গর্ব ফিরিয়ে এনেছেন এবং দশকের পর দশক ধরে চলে আসা বিদেশি আধিপত্যের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছেন।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

তবে ত্রাওরের এই আন্তর্জাতিক প্রতিচ্ছবির বিপরীতে দেশের ভেতরকার পরিস্থিতি অনেকটাই জটিল। গত এপ্রিলে তিনি বুরকিনা ফাসোর জনগণকে ‘গণতন্ত্রের আশা ভুলে যাওয়ার’ আহ্বান জানান, কারণ তিনি দেশটিকে এখন একটি ‘বিপ্লবী পর্যায়’ হিসেবে দেখছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সামরিক সরকার রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে এবং নির্বাচনমুখী বেসামরিক শাসনের পথ থেকে সরে এসেছে। নাইজেরিয়ার বি কনসাল্টিং লিমিটেডের নিরাপত্তা বিশ্লেষক কবির আদামু মনে করেন, ত্রাওরে কার্যকারিতার চেয়ে সার্বভৌমত্বের ওপর ভিত্তি করে নিরাপত্তার কাঠামো সাজিয়েছেন, যা দীর্ঘদিনের বিদেশি ব্যর্থতায় ক্লান্ত জনসাধারণের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।

ত্রাওরের এই জাতীয়তাবাদী নীতি অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হচ্ছে। সরকার ধান ও ভুট্টার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ফসলের উৎপাদনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে এবং কৌশলগত শিল্প খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। এছাড়া ‘ভলেন্টিয়ার্স ফর দ্য ডিফেন্স অব দ্য হোমল্যান্ড’ নামক বেসামরিক বাহিনীর পরিধি বাড়িয়ে দেশজুড়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু এই উদ্যোগের কার্যকারিতা এখনো বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ আল-কায়েদা ও আইএসআইএল সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা এখনো দেশটির বড় একটি অংশের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

সরকারি তথ্যে নিরাপত্তার উন্নতির দাবি করা হলেও, বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। দেশটিতে এখনো ২০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ঘানা ও বুরকিনা ফাসোর সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কাজ করা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মুস্তাফা বাচুর সালামা জানিয়েছেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা এখনো তীব্র এবং সামরিক বাহিনীর দাবির সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ত্রাওরের শাসনকাল বর্তমানে এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতীকী জয় এবং জাতীয়তাবাদী স্লোগান দিয়ে তিনি জনপ্রিয়তা ধরে রাখলেও, দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে তার নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা। রাজধানী ওয়াগাদুগুর এক যুবনেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল জাজিরাকে জানান, তাদের গর্ব করার মতো নেতা প্রয়োজন, তবে সেই গর্ব যেন পরিবারের অন্ন জোগাতে এবং গ্রামগুলোকে রক্ষা করতেও সক্ষম হয়। ক্যাপ্টেন ত্রাওরে এখন কেবল সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবেই নয়, বরং ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার রক্ষক হিসেবে নিজেদের প্রমাণের এক কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছেন।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%