মার্কিন প্রেসিডেন্টের পরস্পরবিরোধী মন্তব্যে দিশেহারা ইরানিরা অনিশ্চয়তার চক্রে বন্দি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি নিয়ে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে চরম অনিশ্চয়তায় দিনাতিপাত করছেন ইরানি নাগরিকরা। যুদ্ধের হুমকি থেকে শুরু করে আলোচনার দাবি—ট্রাম্পের এমন অসংলগ্ন মন্তব্যে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা তেহরানের বাসিন্দারা এখন মানসিক প্রশান্তি ও নিজেদের সুরক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ছয় মাস ধরে চলা এই অস্থিরতায় সাধারণ মানুষ এখন আর খবরের শিরোনামের পেছনে দৌড়াতে আগ্রহী নন।
তেহরানের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী সাতাশ বছর বয়সী ফায়েজেহ জানান, ট্রাম্পের মন্তব্য তাদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেললেও তিনি বিষাক্ত অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়গুলোর ওপর মনোযোগ দিচ্ছেন। তার সহকর্মী রোহাম মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবাদে ট্রাম্প এখন অনেক বেশি কথা বলেন, কিন্তু কাজের চেয়ে বাচালতাতেই তার আগ্রহ বেশি। রোহামের মতে, ইরানি কর্তৃপক্ষের উচিত দেশের ভেতরে ভিন্নমতের জায়গা তৈরি করা, যদিও বর্তমানে তার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ইরানি রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সোমবার তেহরানের খোলা বাজারে প্রতি মার্কিন ডলার ১.৯১ মিলিয়ন রিয়াল দরে বিনিময় হয়েছে। গত জুন মাসে আঞ্চলিক মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক সমঝোতা হওয়ার পর রিয়ালের মান কিছুটা স্থিতিশীল হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে মুদ্রাস্ফীতির হার ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য মূলত বৈশ্বিক বাজার ও তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা, আর এই প্রক্রিয়ায় ইরান কেবল একটি দাবার ঘুঁটি।
তেহরানের সরকারি টেলিভিশনেও ট্রাম্পের এমন অস্থির অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ট্রাম্পের দাবিকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন, তেহরান তাদের নীতিগত অবস্থান থেকে এক চুলও সরবে না। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে ইরান। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী যেকোনো সমঝোতার জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে তেহরান।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটিকে ভবিষ্যতের বৈদেশিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করে তা কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, কোনো চুক্তি বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ শিথিল করা হবে না। একদিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের যুদ্ধ প্রস্তুতির ডাক এবং অন্যদিকে শীর্ষ পর্যায়ের কূটনৈতিক বাকযুদ্ধ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে যুদ্ধের দামামা ও সমঝোতার আশার মধ্যে এক অস্থির দোলাচল অব্যাহত রয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
