গাজা সংকট নিরসনে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিতে ঐকমত্য

গাজায় প্রায় তিন বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে সম্মত হয়েছে হামাস। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এবং মিশর, কাতার ও তুরস্কের সহায়তায় এই রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে, যার মূল শর্ত হলো হামাসের ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমঝোতাকে একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করে একে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার পথে এক অনন্য পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন।
চুক্তির ধারা অনুযায়ী, নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি বাস্তবায়নের সমান্তরালে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করবে। ট্রাম্প তার বিশ দফা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এটিকে গাজার শাসনভার নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে গাজায় শান্তি ফেরানোর এই উদ্যোগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে গত বছরের অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তার সফল বাস্তবায়নের অভাবে সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, যা এবার নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইসরায়েলি মন্ত্রিসভায় এই চুক্তি নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই প্রস্তাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, হামাসের সদস্যদের লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান বন্ধ করা হলে তা ভবিষ্যতের জন্য নতুন কোনো নৃশংসতার সুযোগ তৈরি করবে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সাবেক সেনা প্রধান গাডি আইজেনকোট দাবি করেছেন, বর্তমান চুক্তিতে হামাসকে টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি।
হামাস নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করেছে যে, তাদের নিরস্ত্রীকরণ সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সামরিক অভিযানের সমাপ্তি এবং বাহিনী প্রত্যাহারের ওপর নির্ভরশীল। সংগঠনটির আলোচক গাজি হামাদ জানিয়েছেন, এটি কেবল অস্ত্র সমর্পণের বিষয় নয়, বরং একটি সমন্বিত প্যাকেজ। এর আওতায় গাজার প্রশাসনিক জাতীয় কমিটি গঠন, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে প্যালেস্টাইন ইসলামিক জিহাদসহ বেশ কিছু ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী এই চুক্তির বর্তমান রূপ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলে এই সমঝোতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি প্রধান কাজা ক্যালাস একে শান্তির পথে একটি গঠনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানালেও সতর্ক করেছেন যে, চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে এর সফলতা অনিশ্চিত। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনে এই প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড গাজায় মানবিক বিপর্যয় নিরসনে অবিলম্বে ত্রাণ সরবরাহের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
গাজা শান্তি বোর্ডের পরিচালক নিকোলাই ম্লাদেনভ স্বীকার করেছেন যে, আলোচনাটি একাধিকবার ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, চুক্তির চেয়েও জরুরি হলো এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া। এখন সবার নজর কায়রোতে পরবর্তী বৈঠকের দিকে, যেখানে মিশর, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে আলোচনা করবেন। গাজার সাধারণ মানুষের জন্য এই যুদ্ধবিরতি একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বস্তির বার্তা বহন করবে কি না, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
