রণকৌশল নিয়ে মতপার্থক্যের জেরে ইউক্রেনের শীর্ষ সামরিক ও প্রতিরক্ষা প্রশাসনে বড় রদবদল

ইউক্রেনের সামরিক ও রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বে গত এক সপ্তাহে ব্যাপক রদবদল আনা হয়েছে। অথচ ঠিক এই সময়েই ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনী গত তিন বছরের মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে আসছে। গত ১৫ জুলাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে সরিয়ে দেওয়ার ছয় দিনের মাথায় সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কিকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এই দুই শীর্ষ কর্তার বিদায়ের সাথে সাথে তাদের বেশ কয়েকজন দক্ষ সহকর্মীকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রাশিয়া জনবল এবং ভূখণ্ড হারানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিক থেকেও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ইউক্রেনের দাবি, চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার ৫০০ সৈন্য নিহত অথবা গুরুতর আহত হয়েছে। সেনাপ্রধান সিরস্কির দেওয়া তথ্যমতে, এই প্রথমবার প্রতি মাসে গড়ে ৩২ হাজার সৈন্য হারাচ্ছে মস্কো। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’ (আইএসডব্লিউ)-এর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও তারা মাত্র ৮১.১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখলে নিতে সক্ষম হয়েছে। জুন মাস রাশিয়ার জন্য ছিল বিপর্যয়কর; ঐ মাসে তারা মাত্র ৩০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখল করতে পেরেছে, যা জুলাইয়ে আরও কমে দৈনিক ১.৬ বর্গ কিলোমিটার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
এই রদবদলের নেপথ্যে মূলত ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধই প্রধান কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে ‘আনম্যানড সিস্টেমস’ বা ড্রোন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতভেদ চরমে পৌঁছেছিল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফেদোরভ সামরিক বাহিনীকে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তিতে রূপান্তরের পক্ষে জোর সওয়াল করেছিলেন এবং বিপুল পরিমাণ বাজেট এ খাতে ব্যয় করেছিলেন। অন্যদিকে, সেনাপ্রধান সিরস্কি মনে করতেন, কেবল ড্রোনের ওপর নির্ভর করে রাশিয়াকে পরাজিত করা অসম্ভব। তার মতে, যেখানে শত্রু দেশ কামানের গোলা ও আকাশপথে শক্তিশালী, সেখানে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পুরো সেনাবাহিনীকে ড্রোননির্ভর করে তোলা বাস্তবসম্মত নয়।
ইউক্রেনের নতুন এই কৌশলের প্রভাব ইতিমধ্যেই রণক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। জুন মাসের শুরু থেকে ইউক্রেনের আনম্যানড সিস্টেমস ফোর্সের প্রধান রবার্ট ব্রোভদি জানান, তাদের আক্রমণে রাশিয়ার ১৯৩টি জ্বালানি ট্যাঙ্কার বিকল হয়ে গেছে এবং কার্চ প্রণালীতে রাশিয়ার ফেরি সক্ষমতার তিন-চতুর্থাংশ ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি রাশিয়ার এঙ্গেলস বিমানঘাঁটিতে ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলায় একটি তুপোলেভ-৯৫ কৌশলগত বোমারু বিমান এবং কুরস্কের খালিনো বিমানঘাঁটিতে একটি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। ইউক্রেনের এই লাগাতার হামলায় রাশিয়ার অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়েছে। ক্রাইমিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মস্কোকে ক্ষতিপূরণ বাবদ গুনতে হচ্ছে প্রায় ৫ বিলিয়ন রুবল বা ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
রাশিয়াও এর বিপরীতে ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর অবকাঠামো এবং শস্য রপ্তানি কেন্দ্রগুলোতে পালটা হামলা জোরদার করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কৌশলে দ্রুত সমন্বয় প্রয়োজন এবং আকাশপথের নিয়ন্ত্রণই এই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া এখন তাদের মজুদ থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার দ্রুত নিঃশেষ করছে, যা নির্দেশ করে যে মস্কো সামরিক কৌশলের চেয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ওপর বেশি ঝুঁকছে। তবে ইউক্রেনীয় বাহিনী জানিয়েছে, তারা এখন রাশিয়ার প্রায় ৯৫ শতাংশ ড্রোন এবং ৮৭ শতাংশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম, যদিও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় তাদের এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা