লোহিত সাগরে হুথি অবরোধ ও ইয়েমেন সংঘাত: নতুন করে যুদ্ধের দামামা

ইয়েমেনে চলমান সংঘাত এক নতুন ও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় পুরো অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাবেল মানদেব প্রণালীতে হুতিদের এই তৎপরতা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের ওপর মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার আঁচ সরাসরি ইয়েমেনের এই গৃহযুদ্ধে লেগেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার রাজধানী সানা বিমানবন্দরে ইরান থেকে আসা একটি উড়োজাহাজ আটকাতে বিমান হামলা চালানোর পর থেকেই সংঘাত তীব্রতর হয়। যদিও হুতিরা এই হামলার জন্য রিয়াদকে দায়ী করেছে এবং পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে প্রতিশোধ নিয়েছে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই গৃহযুদ্ধে সামরিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নে এখন নতুন করে সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। সৌদি আরব অতীতে যুদ্ধের পরিধি বিস্তৃত না করার নীতিতে অটল থাকলেও, লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে থাকায় তারা এখন নতুন করে তাদের কৌশল পর্যালোচনার মুখে পড়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর অধীনে বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষাধিক সেনা ও যোদ্ধা রয়েছে বলে বিভিন্ন তথ্যে উঠে এসেছে। জাতীয় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি জায়ান্টস ব্রিগেড, গার্ডিয়ান্স অব দ্য রিপাবলিক এবং নবগঠিত হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্সের মতো বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সরকারি শিবিরের অংশ হিসেবে কাজ করছে। তবে এত বিশাল জনবল থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা এবং সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে, হুতিদের নিজস্ব কাঠামোবদ্ধ প্রায় ২ লক্ষ নিয়মিত সৈন্য এবং বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক যোদ্ধা রয়েছে, যারা দীর্ঘদিনের গেরিলা যুদ্ধে অভ্যস্ত।

সরকারি বাহিনীর চেয়ে সংখ্যার বিচারে এগিয়ে থাকলেও, হুতিদের কেন্দ্রীয় কমান্ড ব্যবস্থা এবং অসম যুদ্ধে পারদর্শিতা তাদের প্রতিপক্ষের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকার নিয়ন্ত্রণ হুতিদের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষায় সহায়তা করে। উল্টোদিকে, সরকারি বাহিনী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় বড় ধরনের কোনো আক্রমণাত্মক অভিযানে যাওয়া তাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। এছাড়া বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে কমান্ডের সমন্বয়ের অভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা সরকারি শিবিরের অন্যতম বড় দুর্বলতা।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সানা পুনরুদ্ধারে কোনো বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আনেনি। তাদের বর্তমান কৌশল মূলত হুতিদের নৌ-চলাচলের সক্ষমতা খর্ব করা এবং চোরাচালান বন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে রিয়াদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সৌদি আরব কি যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনার নীতি বজায় রাখবে, নাকি হুতিদের দমনে নতুন করে কোনো সামরিক অভিযানের ঝুঁকি নেবে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%