লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে তুর্কি সামরিক তৎপরতা কৌশলগত নতুন সমীকরণে কায়রো ও আঙ্কারার সমঝোতা

লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বাহিনীর সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বিস্তৃত করার মাধ্যমে আঙ্কারা উত্তর আফ্রিকার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের সূচনা করেছে। আল জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতদিন ত্রিপোলিভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত তুরস্ক এখন বিদ্রোহী সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে। এই কৌশলগত পরিবর্তন অঞ্চলটিতে একসময়কার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্ক ও মিশরের মধ্যে সম্পর্কের এক অভাবনীয় মেরুকরণ স্পষ্ট করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন ধরে মিশরের সমর্থনপুষ্ট এলএনএ এবং তুরস্কের মদতপুষ্ট ত্রিপোলি সরকারের মধ্যকার লড়াই লিবিয়ার গৃহযুদ্ধকে এক জটিল মোড়ে নিয়ে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে আঙ্কারা এবং হাফতারের জেনারেল কমান্ডের মধ্যে সামরিক স্থাপনার উন্নয়ন, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি এবং লিবীয় কর্মকর্তাদের তুরস্কে প্রশিক্ষণ প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। সাদ্দাম হাফতারের নেতৃত্বে এই কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের নিয়মিত সম্পৃক্ততা রয়েছে। যদিও সরকারিভাবে একে কেবল কারিগরি সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, তবে পর্যবেক্ষকদের মতে এটি দুই পক্ষের মধ্যকার গভীর সামরিক সমন্বয়েরই প্রতিফলন।

মিশরের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাববলয়ে তুরস্কের এই নতুন উপস্থিতি সত্ত্বেও কায়রোর পক্ষ থেকে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বরং সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, লিবিয়ার বিষয়ে আঙ্কারা প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণের আগে কায়রোর সঙ্গে আগেভাগেই সমন্বয় করছে, যা সম্ভাব্য বিরোধের অবকাশ কমিয়ে দিয়েছে। আরব ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সামির রাঘেবের মতে, সুদানসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে তুরস্ক ও মিশরের বর্তমান সমন্বয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তুরস্কের এই নতুন ভূমিকা লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে অন্য কোনো শক্তির প্রভাব বিস্তারের পথ রুদ্ধ করছে, যা মিশরের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

এই সম্পর্কের মূলে রয়েছে তুরস্কের দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। এর মাধ্যমে আঙ্কারা ২০১৯ সালে সম্পাদিত বিতর্কিত সমুদ্রসীমা চুক্তিটি পূর্বাঞ্চলীয় কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য করার পথ প্রশস্ত করছে। যদিও লিবিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফয়সাল বুয়ালরাইগা সতর্ক করে বলেছেন যে, তুরস্ক ও এলএনএর মধ্যকার এই মিত্রতা এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে রূপ নেয়নি। তবে লিবিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো স্থায়ী তুর্কি সামরিক উপস্থিতি ভবিষ্যতে মিশরের জন্য ‘রেড লাইন’ বা সীমালঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পরিশেষে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লিবিয়ার ঘটনাপ্রবাহ এখন কঠোর মেরুকরণের যুগ পেরিয়ে নমনীয় অংশীদারিত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তুরস্ক ও মিশর এখন প্রক্সি যুদ্ধের পরিবর্তে বাস্তববাদী কূটনীতিকে বেছে নিয়েছে, যা অঞ্চলটিতে স্থিতিশীলতা রক্ষার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে এই পারস্পরিক বোঝাপড়া লিবিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধানে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%