লাতিন আমেরিকায় রাজনীতির হাতিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, বরং জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিল ও কলম্বিয়ার মতো দেশগুলোতে এই জনপ্রিয় ফুটবল জার্সি রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ডানপন্থী রাজনৈতিক নেতারা জাতীয় পতাকার রঙের সাথে মিল রেখে তৈরি এই জার্সিগুলোকে নিজেদের দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফুটবলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আবেগকে পুঁজি করে জনপ্রিয়তা অর্জনের কৌশল এখন লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো এবং পরবর্তী সময়ে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত আবেলর্দো দে লা এস্প্রিয়েয়া তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় জাতীয় দলের জার্সি ব্যবহারের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজেদের দেশপ্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবল জার্সি মূলত একটি ‘তৈরি পোশাক’, যা জনগণকে খুব সহজে একীভূত করতে পারে। নির্বাচনী মাঠে রাজনীতিকরা যখন এই জার্সি গায়ে জড়ান, তখন তারা পরোক্ষভাবে ভোটারদের বার্তা দেন যে, তাদের দলই দেশের প্রকৃত ধারক ও বাহক।
তবে এই প্রবণতা দেশগুলোতে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কলম্বিয়ার বামপন্থী নেতা ইভান সেপেদা অভিযোগ করেছেন যে, ডানপন্থীরা জাতীয় প্রতীক ‘চুরি’ করছে, যা দেশের সকল নাগরিকের সম্পত্তি। যদিও আদালতের নির্দেশে নির্বাচনী প্রচারণায় জার্সি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তবুও সমর্থকদের মধ্যে এটি উল্টো প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে সমর্থকরা জার্সি পরে রাস্তায় নেমে আসেন, যা তাদের কাছে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদে পরিণত হয়।
ব্রাজিলের পরিস্থিতিও অনেকটা একই রকম। দেশটিতে বলসোনারো পরিবারের হাত ধরে হলুদ জার্সি ডানপন্থার প্রতীক হয়ে উঠলে এক পর্যায়ে সাধারণ মানুষ এটি পরতে দ্বিধাবোধ করতে শুরু করেছিলেন। এমনকি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় অনেক সমর্থক হলুদ জার্সির বদলে বিকল্প নীল জার্সি বেছে নিয়েছিলেন, যাতে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভুল ব্যাখ্যা না হয়। তবে বর্তমানে বামপন্থীরাও পাল্টা কৌশল হিসেবে জার্সিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন, যেন জাতীয় পতাকার রঙ ও প্রতীক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কুক্ষিগত না থাকে।
সমাজবিজ্ঞানী ব্রায়ান ক্লিফটের মতে, ফুটবল জার্সি হলো জাতীয়তার একটি শক্তিশালী রূপক। লাতিন আমেরিকার মতো দেশগুলোতে, যেখানে ফুটবলের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি পাওয়া সহজ, সেখানে রাজনীতিকরা এই আবেগকে রাজনৈতিক মূলধন হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে এই লড়াইয়ের মাঝেও পাওলো দুয়ার্তের মতো অনেক সাধারণ ফুটবলপ্রেমী আছেন, যারা রাজনীতির চেয়ে খেলার প্রতি তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আবেগকেই বেশি প্রাধান্য দিতে চান। তাদের কাছে ফুটবল জার্সি রাজনীতির কোনো সস্তা হাতিয়ার নয়, বরং এটি তাদের গর্ব ও জাতীয় ঐতিহ্যের ধারক।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা