গ্রিসে দাবানল মোকাবিলায় মহাকাশ প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত

গ্রীষ্মকাল এলেই দাবদাহ ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কবলে পড়া গ্রিস এবার সুরক্ষায় প্রযুক্তির এক শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর এথেন্সের একটি উপশহরে হেলেনিক স্পেস সেন্টারের (এইচএসসি) তরুণ প্রকৌশলীরা ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘূর্ণায়মান চারটি স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বনাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়া রোধে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশটিতে খরা ও দাবানলের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই কৃত্রিম উপগ্রহগুলো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তিসম্পন্ন এই স্যাটেলাইটগুলো মাটির তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পরিমাপ করে কয়েক ঘণ্টা আগেই দাবানল কোথায় হতে পারে, তার নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। অগ্নিকাণ্ড শুরু হলে বনভূমি ও ভূখণ্ডের উচ্চতা বিশ্লেষণ করে এই প্রযুক্তি অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের জন্য কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে সহায়তা করে। এছাড়া ঘন ধোঁয়ার ভেতর দিয়েও স্যাটেলাইটগুলো আগুনের মূল উৎস বা ‘হট স্পট’ শনাক্ত করতে পারে, যা হেলিকপ্টার ও বিমানে করে জল নিক্ষেপের অভিযানকে আরও লক্ষ্যভেদী করে তোলে।
এইচএসসির তথ্যমতে, একটি ব্রিফকেসের সমান আকৃতির এই ক্ষুদ্র স্যাটেলাইটগুলো দক্ষিণ মেরু থেকে উত্তর মেরু পর্যন্ত পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এবং দিনে অন্তত দুবার গ্রিসের ওপর দিয়ে যায়। বর্তমানের চারটি স্যাটেলাইটের পাশাপাশি আরও সাতটি মাল্টি-স্পেকট্রাল স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা বনাঞ্চলের স্বাস্থ্য, ক্লোরোফিল ও জলীয় চাপের মাত্রাও পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গ্রিসের প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সুরক্ষা বলয়ের আওতায় নিয়ে আসবে।
উল্লেখ্য, দুই বছর আগেও গ্রিসে অগ্নিকাণ্ড শনাক্তকরণ ও সতর্কবার্তা পৌঁছানোর কাজটি করা হতো মূলত টহল দল, অগ্নিনির্বাপক যান এবং ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে। তবে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজারটি বনাঞ্চল ও ফসলি জমিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুরনো এই পদ্ধতিগুলো অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছে। ২০২১ সালের ভারিবোবি ও এভিয়া দ্বীপের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং ২০২৩ সালের পশ্চিম থ্রেস ও পূর্ব মেসিডোনিয়ার ৭২ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে যাওয়ার মতো বিপর্যয়গুলো থেকে শিক্ষা নিয়েই গ্রিস এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় জোর দিয়েছে।
অগ্নিনির্বাপক বাহিনী এখন সার্বক্ষণিক ড্রোনের মাধ্যমেও বনাঞ্চল ও লোকালয়ে নজরদারি চালাচ্ছে। এইচএসসির কর্মকর্তাদের মতে, অগ্নিকাণ্ডের শুরুতে এক মিনিট দেরি হলেও তা বিশাল আকার ধারণ করতে পারে, আর ড্রোন ও স্যাটেলাইটের সমন্বিত তথ্য সেই ঝুঁকি কমিয়ে আনছে। এই প্রযুক্তি কেবল আগুন নেভাতেই নয়, বরং মনুষ্যসৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত ও অপরাধীদের শনাক্তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৪৩০ ও ৪২৩ জনে দাঁড়িয়েছে এবং জরিমানার পরিমাণও ১৫ লাখ ইউরো ছাড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা