মরক্কোর সাথে কৌশলগত সম্পর্ক পুনর্গঠনে ফ্রান্সের নতুন উদ্যোগ

ফ্রান্স ও মরক্কোর মধ্যকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নুর সাম্প্রতিক দুই দিনের মরক্কো সফর—যা ১৫ ও ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে—মূলত প্যারিস ও রাবাতের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুনভাবে সংহত করার একটি বড় পদক্ষেপ। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিতর্কিত পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে ফ্রান্সের স্বীকৃতি দেওয়ার পর এটিই ছিল দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
সফরকালে লেকর্নুর সঙ্গে প্রায় এক ডজন মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন, যা উত্তর আফ্রিকায় ফ্রান্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সম্পর্ক পুনর্গঠনের দৃঢ় সংকল্পকেই প্রতিফলিত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিসা নিষেধাজ্ঞা, বিচারিক সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে ফ্রান্স এখন মরক্কোকে একটি নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক সহযোগী হিসেবে দেখছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ উইসাল মারসাউইয়ের মতে, এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফর নয়, বরং রাজনৈতিক সমঝোতাকে ব্যবহারিক সহযোগিতায় রূপান্তরের প্রাথমিক ধাপ। মরক্কো বর্তমানে ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকান বাজারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। টাঞ্জিয়ার মেড বন্দর কমপ্লেক্সসহ বিশাল অবকাঠামো ও শিল্পাঞ্চল ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য মরক্কোকে একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
ফ্রান্সের জন্য এই সম্পর্ক কেবল অতীত ইতিহাস পুনরুদ্ধারের বিষয় নয়, বরং আফ্রিকান মহাদেশে নিজেদের হারানো বাণিজ্যিক অবস্থান সুসংহত করার কৌশল। মরক্কোর ইএনসিজি কেনিট্রার অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আহলাম কাফাস মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা এবং উন্নত প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলোতে ফ্রান্সের সহযোগিতা মরক্কোর অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা বয়ে আনবে। এই অংশীদারিত্ব দেশটিকে উচ্চমূল্যের শিল্প পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতাও এই সম্পর্কের মূল কেন্দ্রে রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং অভিবাসন সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশ এখন আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে ফ্রান্সের এই নতুন অবস্থান কেবল প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ফরাসি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি স্থায়ী কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
সবশেষে, এই কূটনৈতিক পুনর্মিলন কেবল সাময়িক কোনো রাজনৈতিক ঐকমত্য নয়। আরব সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যান্ড হিউম্যান স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা নূহ এল হারমুজির ভাষ্যমতে, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত আন্তঃনির্ভরশীলতার দিকে মোড় নিচ্ছে। উভয় দেশের এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি উত্তর আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চলে নতুন কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা