ফিলিস্তিনের অকৃত্রিম বন্ধু ও গাজার অবরোধ ভাঙা কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদের জীবনাবসান

ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় আপসহীন কণ্ঠস্বর এবং গাজার ওপর আরোপিত অবরোধ ভাঙার প্রথম আরব নেতা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে রইলেন কাতারের ফাদার আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। গত রোববার তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ফিলিস্তিনি জনপদে। আঞ্চলিক রাজনীতির কুশলী হিসেবে পরিচিত এই রাষ্ট্রনায়ক তাঁর কর্মজীবনে ফিলিস্তিনের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যা তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে থাকবে।
ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তিনি প্রায়ই আঞ্চলিক বলয়ের স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে তিনি যখন গাজা সফর করেন, তখন সেটি ছিল ছয় বছর ধরে চলা শ্বাসরুদ্ধকর অবরোধের এক চরম সংকটকাল। কাতারের তৎকালীন আমির শেখ হামাদ তাঁর স্ত্রী শাইখা মোজা বিনতে নাসের ও উচ্চপর্যায়ের এক প্রতিনিধিদল নিয়ে গাজায় পদার্পণ করেন, যা বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল।
হামাসের রাজনৈতিক দপ্তরের প্রধান খালেদ মেশাল আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শোক প্রকাশ করে বলেন, জেরুজালেম, গাজা এবং পুরো ফিলিস্তিন আজ এই মহান নেতাকে হারিয়ে কাঁদছে। তিনি ছিলেন প্রথম আরব ও মুসলিম নেতা, যিনি প্রতিকূলতার সব দেয়াল ভেঙে গাজার জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর এই সফরকে ফিলিস্তিনিদের কাছে অবরোধ ভঙ্গের একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে দেখা হয়।
গাজায় থাকাকালীন শেখ হামাদ অঞ্চলের পুনর্গঠনে অনুদান ২৫৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৪০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। তাঁর এই সহায়তা আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিল। গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে এবং শাইখা মোজাকে মানবিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।
শেখ হামাদের ফিলিস্তিনপ্রীতি কেবল গাজা সফরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৯৯ সালে তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম নেতা হিসেবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে গিয়ে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ আল-শেখ জানান, রামাল্লায় আরাফাতের সদর দপ্তরে ইসরায়েলি অবরোধের সময় আমির গভীর বেদনাহত হয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ইসরায়েলি হামলা যেন তাঁর নিজের দেশের ওপর আঘাত।
তাঁর শাসনামলে কাতারের অর্থায়নে নির্মিত খান ইউনিসের ‘শেখ হামাদ সিটি’ প্রকল্পটি ৫৩টি আধুনিক বহুতল ভবনসহ হাজারো নিম্ন আয়ের পরিবারের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। এছাড়া ২০১৯ সালে চালু হওয়া ‘শেখ হামাদ হাসপাতাল ফর রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড প্রোস্থেটিকস’ গাজার পঙ্গু ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য আশার আলো হয়ে ওঠে। যদিও গত অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞে এসব অবকাঠামোর অনেক কিছুই আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
তবে ধ্বংসের মুখেও হাসপাতালটি তাঁর মানবিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। হাসপাতালের একমাত্র সিটি স্ক্যানার এবং কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন শাখাটি বর্তমান যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতায় গাজার হাজারো মানুষের শেষ ভরসা। একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে তিনি বিশ্বাস করতেন, ফিলিস্তিনিদের মুক্তি অর্জনে তাদের নিজস্ব সংগ্রামই প্রধান চালিকাশক্তি। তাঁর অকাল প্রয়াণ বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনি স্বাধিকার আন্দোলনের সমর্থকদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা