ক্যামেরুনে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমে গতি এলেও অনিশ্চয়তায় লক্ষাধিক শিশু

ক্যামেরুনে শিশুদের জন্মনিবন্ধনের আওতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা জোরদার হলেও এখনো লক্ষ লক্ষ শিশু আইনি স্বীকৃতির বাইরে থেকে যাচ্ছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় গারুয়া ২ পৌরসভার মেয়র উমারু সান্দা সম্প্রতি একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। ইউনিসেফের সহায়তায় সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত এই কর্মসূচিতে স্থানীয় পর্যায় থেকে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমে গতি আনার স্বীকৃতিস্বরূপ তার পৌরসভাকে ‘সিটিজেনশিপ চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে ভূষিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ক্যামেরুনের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুর জন্মনিবন্ধন সনদ পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং জন্মের ৯০ দিনের মধ্যে তা বিনামূল্যে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর নিবন্ধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর পরিবারগুলোকে আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়, যা অনেক অভিভাবকের জন্যই সাধারণ সীমার বাইরে।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ক্যামেরুনের প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বর্তমানে প্রায় ১৫ লক্ষ শিশু জন্মনিবন্ধন সনদ ছাড়াই স্কুলে পড়াশোনা করছে, যা মোট প্রাথমিক শিক্ষার্থীর প্রায় ৩০ শতাংশ। আইনি পরিচয়ের এই অভাব শিশুদের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সঠিক নথিপত্র না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হতে বাধা দেওয়া হয় এবং সরকারি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

ইউনিসেফের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ৫ লক্ষ ৬০ হাজার শিশুর জন্ম হলেও এর মধ্যে মাত্র ৪৩.৭৭ শতাংশের আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। সংস্থাটির শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্সিস মায়াংয়ের মতে, পরিচয়পত্রহীন শিশুদের সহজে শনাক্ত বা ট্র্যাক করা সম্ভব হয় না। এতে তাদের পাচারসহ বিভিন্ন ধরনের শোষণ ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

এই সংকট মোকাবিলায় ২০২৪ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ‘মেয়র্স ফোরাম অন বার্থ রেজিস্ট্রেশন’ থেকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলো এক বিশেষ সনদে স্বাক্ষর করে। এর ধারাবাহিকতায় ইউনিসেফ ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে ‘মাই নেম’ নামক একটি প্রচারাভিযান চালু করা হয়, যার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১৭ হাজারেরও বেশি শিশুকে নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। গারুয়া ২ পৌরসভা ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সনদ প্রদানের ব্যবস্থা চালু করেছে, অন্যদিকে তিকো পৌরসভা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা পৌঁছে দিতে স্থানীয় নেতাদের সহায়তা নিচ্ছে।

তবুও এই অগ্রগতি সত্ত্বেও সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা পুরোপুরি কাটেনি। অনেক অভিভাবক এখনো শিশুদের জন্মনিবন্ধনকে জরুরি মনে করেন না, যতক্ষণ না তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা জাতীয় পরীক্ষায় বাধার সম্মুখীন হন। এছাড়া গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় কন্যাশিশুদের প্রতি অবহেলা ও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিও জন্মনিবন্ধনের হার কম হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী ১৬ কোটি ৬০ লক্ষ শিশু এখনো নিবন্ধিত নয়। তাই প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক পরিবর্তনই এই সংকট নিরসনের মূল চাবিকাঠি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%