হরমুজ প্রণালীতে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতেই বৈশ্বিক বাজারে উদ্বৃত্তের শঙ্কা

হরমোজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর কাতারে শুরু হওয়া পরোক্ষ আলোচনার জের ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম টানা তিন দিন নিম্নমুখী রয়েছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার হরমোজ প্রণালী দিয়ে ৩৫টি তেল ও গ্যাস ট্যাংকার পার হয়েছে, যা যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
বাজার বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মর্গান স্ট্যানলি গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো তেলের দামের পূর্বাভাস কমিয়ে এনেছে। প্রতিষ্ঠানটির সতর্কতা অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের অতিরিক্ত সরবরাহ বা ‘গ্ল্যাট’ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীন তাদের আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় এই উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতির স্থায়িত্ব নির্ভর করছে চীন কত দ্রুত তাদের আগের আমদানির পরিমাণে ফিরে আসে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কতটা টিকে থাকে তার ওপর।
জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১.১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭০.৭৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ১.২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৬৭.৭৪ ডলারে নেমে এসেছে। রয়টার্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী পরবর্তী ৬০ দিন জাহাজগুলো মাশুল ছাড়াই এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। তবে তেহরান ও ওমানের যৌথ নিয়ন্ত্রণে এই জলপথ থাকার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে।
জার্মানির ফিলিপস-ইউনিভার্সিটি মারবুর্গের অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান জানিয়েছেন, বাজারের এই পরিস্থিতিকে নিশ্চিত অতিরিক্ত সরবরাহ হিসেবে দেখা ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলেও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই সমঝোতা আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এরপর এই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় বিশ্ববাজারের স্থিতিশীলতা এখনো বড় প্রশ্নের মুখে।
এদিকে, আমেরিকার দেশগুলোতে তেল উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে বাড়তি চাপের সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র দৈনিক ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩৪ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। তবে বিশ্লেষক কেভিন মরিসনের মতে, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন অবকাঠামোর সংস্কার ছাড়া তেল সরবরাহ পুরোপুরি যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে আসা আগামী বছরের আগে সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল বাজার না বলে, উচ্চ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সৃষ্ট একটি সাময়িক বাড়তি সরবরাহের ঝুঁকি হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা