ইরাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আধাসামরিক বাহিনী একীভূতকরণের উদ্যোগ ও অনিশ্চয়তা

ইরাকের নিরাপত্তা কাঠামো ঢেলে সাজাতে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে অস্ত্র ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে পার্লামেন্টে দেওয়া নিজের প্রথম ভাষণে তিনি সুস্পষ্টভাবে জানান, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈশ্বিক শক্তির বিরাগভাজন হওয়া এড়াতে আধা-সামরিক গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতার রাশ টেনে ধরা এখন সময়ের দাবি। ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের পর থেকেই ইরাকে ইরানপন্থী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে, যা দেশটির স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরাকের অর্থনীতি চরম সংকটের মুখে পড়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই সংকটের ফলে দেশটির তেল রপ্তানি প্রতিদিন ৩৩ লক্ষ ব্যারেল থেকে কমে মার্চ মাসে মাত্র ৬ লক্ষ ব্যারেলে নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, ইরাকের জাতীয় বাজেটের ৯০ শতাংশই আসে তেল খাত থেকে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির বর্তমান শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে অস্ত্র থাকা কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রভাবশালী শিয়া নেতা মুক্তাদা আল-সদর তার নিজস্ব সশস্ত্র শাখা ‘সারা ইয়া আল-সালাম’-কে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা করে রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনীর অধীনে নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। আল-সদরের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী আল-জাইদি। এছাড়া পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা পিএমএফ-এর প্রধান ফালেহ আল-ফায়য়াদও সংগঠনটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে কাতাইব হেজবুল্লাহ ও হারাকাত আল-নুজাবার মতো শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো এখনো সরকারের এই আহ্বানে সাড়া দেয়নি।

ইরাকি রাজনীতি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যেসব গোষ্ঠী সরকারের নির্দেশ মানছে না, তারা অচিরেই কোনঠাসা হয়ে পড়বে। তবে অস্ত্রধারী গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে সরকার ধৈর্য ও কৌশলী অবস্থানের দিকে হাঁটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পিএমএফ ও কুর্দিশ পেশমেরগাসহ অন্যান্য বাহিনীকে একীভূত করে একটি নতুন নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাবও বর্তমানে আলোচনার টেবিলে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মুক্তাদা আল-সদরের এই কৌশলগত অবস্থানকে তার রাজনীতিতে ফিরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রহমান আল-জেবুরির মতে, সশস্ত্র গোষ্ঠীর চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব যে ভবিষ্যতে বেশি কার্যকর হবে, তা আল-সদর অনুধাবন করতে পেরেছেন। তবে দীর্ঘদিনের সামরিক শক্তিধর এসব গোষ্ঠীকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় এখনো কাটেনি। ইরাকের বর্তমান ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে আশাবাদী হওয়ার চেয়ে বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষেই মত দিয়েছেন বিশ্লেষক হানি আশুর।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%