প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ার নতুন কৌশলগত উদ্যোগ

তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত করতে জাকার্তায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। বুধবার ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুগিয়োনো। সফরকালে হাকান ফিদান ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। তুর্কি সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল উভয় দেশের বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের পরিধি বিস্তৃত করা।
উভয় দেশ প্রতিরক্ষা শিল্প, জ্বালানি, পরিবহন অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং হালাল পণ্য শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে দুই দেশ বাণিজ্যের পরিমাণ ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা অর্জনে এই আলোচনা নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২১০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০২৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২৪০ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৯৪ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মেরুদণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি এবং সাজোয়া যান তৈরির সক্ষমতাকে ইন্দোনেশিয়া তাদের সামরিক আধুনিকায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। জ্বালানি খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পেও তুরস্কের বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বিত বিকাশে উভয় রাষ্ট্রই বৈশ্বিক মানচিত্রে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সচেষ্ট।
ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া উভয়ই ‘মাঝারি শক্তির’ দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তুরস্ক ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান সামুদ্রিক পথে কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থাকার ক্ষেত্রেও দেশ দুটির দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর মিল রয়েছে। জি-২০, ওআইসি এবং জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের যৌথ তৎপরতা বিশ্বরাজনীতিতে তাদের প্রভাব বাড়িয়ে তুলছে।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছে। উভয় দেশই নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা এবং যুদ্ধবিরতির দাবিতে সোচ্চার। সম্প্রতি গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক ইন্দোনেশীয় কর্মীদের উদ্ধারে তুরস্কের সক্রিয় ভূমিকা দুই দেশের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাজনৈতিক ও কৌশলগত এই মেলবন্ধন ভবিষ্যতে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা এবং বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা