মিথেন নিঃসরণ কমালে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে, ইরান সংকটের প্রভাবও কমতে পারে: প্রতিবেদন

জীবাশ্ম জ্বালানি খাত থেকে মিথেন নিঃসরণ কমানো গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান সংকট যখন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি করেছে, তখন মিথেন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার ‘বৈশ্বিক মিথেন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ২০২৬’-এ বলা হয়েছে, তেল, গ্যাস ও কয়লা শিল্প মানব কর্মকাণ্ড থেকে সৃষ্ট মোট মিথেন নিঃসরণের প্রায় ৩৫ শতাংশের জন্য দায়ী। তবে এসব খাত থেকে মিথেন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের কার্যক্রম থেকে মিথেন নিঃসরণ কমছে—এমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। অথচ নিঃসরণ কমানোর কার্যকর ও পরীক্ষিত উপায়গুলো সম্পর্কে বিশ্ব ইতিমধ্যে জানে।’
মিথেন জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। বায়ুমণ্ডলে এটি কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক কম সময় অবস্থান করলেও ২০ বছরের হিসাবে এর উষ্ণতা সৃষ্টির ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে প্রায় ৮০ গুণ বেশি।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার হিসাবে, তেল, গ্যাস ও কয়লা খাত থেকে প্রতি বছর মোট প্রায় ১২ কোটি ৪০ লাখ টন মিথেন নিঃসরণ হয়। এর মধ্যে তেল খাত থেকে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ টন, কয়লা খাত থেকে ৪ কোটি ৩০ লাখ টন এবং প্রাকৃতিক গ্যাস খাত থেকে ৩ কোটি ৬০ লাখ টন মিথেন নিঃসরণ হয়।
এ ছাড়া জৈবশক্তি উৎপাদন ও ব্যবহারের মাধ্যমে আরও প্রায় ২ কোটি টন মিথেন নিঃসরণ হয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রান্না ও উত্তাপের জন্য ব্যবহৃত প্রচলিত জৈব জ্বালানির অসম্পূর্ণ দহন এর অন্যতম কারণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল ও গ্যাস খাতের কার্যক্রম থেকে মিথেন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাসের সমপরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস তুলনামূলকভাবে দ্রুত বাজারে আনা সম্ভব। জ্বালানি সরবরাহে চলমান সংকটের সময় এটি বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা।
এ ছাড়া অপ্রয়োজনীয়ভাবে গ্যাস পোড়ানোর প্রথা বন্ধ করেও আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি ঘনমিটার গ্যাসের সমপরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংকটের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর তেলের দাম বেড়ে যায়। এর পর ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আরও চাপের মুখে পড়ে।
এপ্রিল মাসে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ এখনো সীমিত রয়েছে। চলমান সংকট বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে এবং বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ প্রবাহ ব্যাহত করছে।
এদিকে, শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-এর বর্তমান সভাপতি হিসেবে ফ্রান্স মিথেন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ জোরদার করতে সোমবার সরকারি কর্মকর্তা, শিল্পখাতের নেতা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করেছে।
জাতিসংঘের আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জলবায়ু সম্মেলনের আগে মিথেন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগকে আরও কার্যকর করাই এই বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য।
ফ্রান্সের পরিবেশগত পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মনিক বারবুট বলেন, ‘মিথেন নিঃসরণ কমানোর কার্যকর সমাধান বাস্তবায়নে গতি আনতে আজকের আলোচনা আমাদের একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করবে বলে আমি আন্তরিকভাবে আশা করি।’
তিনি বলেন, ‘মিথেন নিঃসরণ কমানো কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। কেউ একা এই লড়াইয়ে জয়ী হতে পারবে না।’
বিশ্ব ২০২০ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে মিথেন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা অর্জনের পথ থেকে এখনো অনেক দূরে রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মনিক বারবুট বলেন, ‘মিথেন নিঃসরণ কমানো এমন কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম, যার মাধ্যমে একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি কমানো, বায়ু পরিষ্কার রাখা, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব।’
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা