গাজার উত্তাল উপকূলে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ঢেউয়ের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছেন একদল দুঃসাহসী সার্ফার। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ আর তাবু গেড়ে থাকা মানুষের আহাজারি ছাপিয়ে নীল জলরাশিই এখন তাদের একমাত্র প্রশান্তির জায়গা। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আক্রমণের ভয়কে তুচ্ছ করে ঢেউয়ের তালে তাল মিলিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এএফপি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের ভয়াবহতা আর গোলাগুলির শব্দ সত্ত্বেও গাজা সিটির সমুদ্র সৈকতে নিয়মিত চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন এক তরুণ সার্ফার দল।
২৩ বছর বয়সী সার্ফার তাহসিন আবু আসি জানান, ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ভেসে বেড়ানোর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বাবার কাছ থেকে শেখা এই খেলাটিই এখন তার জীবনের বড় অবলম্বন। যুদ্ধের বিভীষিকা আর প্রতিদিনের অনিশ্চয়তার মাঝে এই সমুদ্রই তাদের কিছুটা দম ফেলার সুযোগ করে দেয়। যদিও উপকূলীয় এই অঞ্চলে সমুদ্রপথেও শান্তি নেই। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ইসরায়েলি নৌবাহিনীর গুলিতে আহত দুই জেলের ভর্তির ঘটনা কিংবা গাজা সিটির অদূরে তিন জেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পরিস্থিতি যে কতটা অস্থিতিশীল, তা স্পষ্টভাবে জানান দেয়।
গাজার সার্ফারদের লড়াইটা কেবল প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথেই নয়, বরং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তীব্র সংকটও তাদের বড় প্রতিপক্ষ। উনিশ বছর বয়সী আব্দুল রহিম ওস্তাদ জানান, সার্ফিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় মোম বা অন্যান্য সরঞ্জাম না পাওয়ায় তারা মোমবাতির মোম ব্যবহার করে কোনোমতে খেলাটি টিকিয়ে রেখেছেন। প্রায় দুই দশক পুরনো জরাজীর্ণ সার্ফবোর্ডগুলোকে তারা পরম মমতায় আগলে রাখেন, যেন সেগুলো এক অমূল্য সম্পদ। কারণ নতুন সরঞ্জাম পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, আর একটি বোর্ড হারিয়ে ফেলা মানেই খেলায় ইতি টানা।
যুদ্ধের আগে এই সার্ফার দলে সদস্য সংখ্যা ছিল ১৭ জন, যা বর্তমানে নেমে এসেছে মাত্র ৩ জনে। আঠারো বছর বয়সী খলিল আবু জিয়াব দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে এই খেলার সাথে যুক্ত থাকলেও যুদ্ধের ভয়াবহতায় তার স্বপ্নগুলো আজ প্রায় ধূলিসাৎ। তবুও আশার প্রদীপ নেভেনি তাদের। খলিলের স্বপ্ন, একদিন হয়তো গাজার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন তিনি। অবরুদ্ধ এই উপত্যকায় সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়াই এখন তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরণা; কারণ সাগরের উত্তাল ঢেউ না থাকলে গাজার জীবন হয়তো অনেক আগেই স্থবির হয়ে পড়ত।