ইংল্যান্ডে বিদায়ঘণ্টা বাজলেও বিশ্বমঞ্চে নতুন ইতিহাস লিখে অমর লিওপার্ডরা

পঁচিশ বছরেরও বেশি সময়ের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বমঞ্চে ফেরা ডিআর কঙ্গোর ফুটবল দল ‘লেপার্ডস’ এবারের বিশ্বকাপে যে রূপকথা তৈরি করেছে, তা পরাজয় দিয়ে শেষ হলেও দেশটির মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের কাছে মাথা নত করতে হলেও এই টুর্নামেন্টে তাদের অদম্য মানসিকতা বিশ্বকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে কঙ্গোলিজ ফুটবলের স্বর্ণযুগের সঙ্গে। বুনিয়া থেকে কিনশাসা—পুরো দেশ আজ গর্বিত তাদের অকুতোভয় ফুটবলারদের নিয়ে, যারা দীর্ঘ ৫২ বছরের ব্যর্থতার গ্লানি মুছে নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

১৯৭৪ সালের সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনো অনেকের মনে দাগ কেটে আছে, যখন জায়ারে নামে পরিচিত দলটি কোনো গোল না করেই বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল। তবে এবারের চিত্রপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলের নতুন প্রজন্মের কাণ্ডারি ইয়োয়ান উইসা এই বিশ্বকাপের আসরে তিন গোল করে নিজের নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসে। পর্তুগালের বিপক্ষে তার সেই ঐতিহাসিক হেডারটি কেবল একটি গোল ছিল না, ছিল কয়েক দশকের অবজ্ঞা ও কষ্টের অবসান। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, উইসার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স কঙ্গোর ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বাস জুগিয়েছে যে, বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে লড়াই করার সামর্থ্য তাদের রয়েছে।

বাছাইপর্বে ক্যামেরুন ও নাইজেরিয়ার মতো দলকে হারিয়ে এবং প্লে-অফে জ্যামাইকাকে পরাজিত করে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছিল লেপার্ডসদের রূপকথার যাত্রা। মূল পর্বে পর্তুগালের সঙ্গে ড্র, উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জয় এবং কলম্বিয়ার সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর শেষ ষোলোয় ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয় তারা। ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে লড়াই করাটা ছিল তাদের সাহসিকতার চূড়ান্ত পরীক্ষা। যদিও শেষ পর্যন্ত হ্যারি কেইনের দলের কাছে তাদের বিদায় ঘণ্টা বেজেছে, কিন্তু ম্যাচের পর ইংলিশ অধিনায়ক নিজেও স্বীকার করেছেন যে, লেপার্ডসদের রক্ষণভাগ ভাঙা কতটা কঠিন ছিল।

কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্র অবশ্য এই পরাজয়কে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। ফরাসি এই কৌশলবিদ মনে করেন, অভিজ্ঞতার সামান্য ঘাটতিই তাদের চূড়ান্ত সাফল্য থেকে দূরে রেখেছে। খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব দিয়ে তিনি বলেছেন, বিশ্বের সেরা তারকাদের বিপক্ষে তারা যে লড়াকু মানসিকতা দেখিয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছুর প্রতিশ্রুতি দেয়। তার মতে, বড় বড় দলের বিপক্ষে সমানে সমান লড়াই করাটাই এখন কঙ্গোলিজ ফুটবলের নতুন মানদণ্ড।

বিজ্ঞাপন

বুনিয়ার সাধারণ ফুটবলপ্রেমী থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের সমর্থক—সবার চোখেমুখে আজ বিষাদ থাকলেও মনে আছে একরাশ তৃপ্তি। দীর্ঘ ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের ময়দানে নিজের দেশের জাতীয় সংগীত শুনতে পাওয়াটা ছিল অনেক সমর্থকের জন্য এক আবেগঘন মুহূর্ত। আজকের এই বিদায় হয়তো অনেকের কাছে যন্ত্রণার, কিন্তু কঙ্গোর ফুটবল ইতিহাসে এই দলটি যে ঐক্যের সুর বেঁধে দিয়েছে, তা আগামী প্রজন্মের কাছে এক অবিস্মরণীয় গল্প হয়ে থাকবে। জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে উঠে লেপার্ডসরা প্রমাণ করেছে, স্বপ্ন দেখলে তা ধীরেসুস্থে হলেও বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।

0%
0%
0%
0%