চলমান ফুটবল বিশ্বকাপে ফিফার প্রবর্তিত তিন মিনিটের 'হাইড্রেশন ব্রেক' বা পানিবিরতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের ঝড় বইছে। খেলোয়াড়, কোচ থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক—সবার কাছেই এই নিয়মটি এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিফা এটিকে খেলোয়াড়দের কল্যাণের দোহাই দিয়ে বাধ্যতামূলক করলেও, মাঠের বাস্তবতায় এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ফুটবলাররাই। নেদারল্যান্ডসের রক্ষণভাগের তারকা ভার্জিল ফন ডাইক সরাসরি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে জানিয়েছেন যে, প্রতিটি ম্যাচের আবহাওয়ার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, ঢালাওভাবে সব ম্যাচে এটি কার্যকর করা যুক্তিযুক্ত নয়।
বেলজিয়ামের ইউরি টিলেমানসও একই সুরে কথা বলেছেন। ফিফার পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়েছিল, সব দলের জন্য সমান শর্ত নিশ্চিত করতে আবহাওয়ার তাপমাত্রা নির্বিশেষে প্রতিটি ম্যাচেই এই বিরতি ডাকা হবে। তবে আবহাওয়াবিদ এভারটন ফক্সের মতে, ডালাস, হিউস্টন, আটলান্টা বা ভ্যাঙ্কুভারের মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামগুলোতে এই বিরতির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। অনেক বিশ্লেষক এবং খেলোয়াড় মনে করছেন, এই বিরতি মূলত মাঠের খেলার চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিবিসি স্পোর্টসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তিন মিনিটের বিরতিতে বিজ্ঞাপন প্রচার করে ফিফা কোটি কোটি ডলার আয়ের পথ তৈরি করেছে, যা নিয়ে কানাডার খেলোয়াড় অ্যালাস্টার জনস্টন ক্ষোভ প্রকাশ করে একে 'বাণিজ্যিক বিরতি' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মাঠের খেলার ছন্দেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক ম্যাচে দেখা গেছে, দারুণ ছন্দে থাকা দলগুলোর গতি এই বিরতির কারণে থমকে গেছে। বিশেষ করে কুরাকাও এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মতো দলগুলো এই বিরতির পর নিজেদের ছন্দ হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়েছে। আবার বিপরীত চিত্রও দেখা যাচ্ছে কোচদের মন্তব্যে। বেলজিয়ামের কোচ রুদি গার্সিয়া এবং ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ে দেশম এই বিরতিকে কৌশলগত আলোচনার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। দেশমের মতে, এই সময়টি বাড়তি দুই কোয়ার্টারের মতো কাজ করছে, যা কোচদের ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তনের সুযোগ করে দিচ্ছে।
টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বের শুরু থেকেই গ্যালারিতে থাকা দর্শকরা এই বিরতি নিয়ে নিয়মিত অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নানা বিদ্রূপাত্মক কন্টেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে। কাতার বিশ্বকাপে স্বাগতিকদের বিপক্ষে কানাডার ৬-০ ব্যবধানের হারের ম্যাচেও এই বিরতি নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। সব মিলিয়ে, ফিফার এই নতুন নিয়ম কেবল মাঠের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি বৈশ্বিক ফুটবল সংস্কৃতির এক বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের চেয়েও বাণিজ্যের আধিপত্যই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।