প্রহসনের গণভোট ছিল অবৈধ ও অসাংবিধানিক: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সম্পন্ন হওয়া গণভোটকে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও অবৈধ বলে অভিহিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। রবিবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে গণঅধিকার পরিষদের আয়োজনে ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। মন্ত্রী দাবি করেন, কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর আড়ালে এই ছলচাতুরির গণভোট জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেই গণভোটে চারটি প্রশ্নের বিপরীতে কেবল একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের যে বিধান রাখা হয়েছিল, তা ছিল অযৌক্তিক। তিনি আরও বলেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর পক্ষে জনগণের অবস্থান যাচাইয়ে কেবল একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নে গণভোট হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। এ সময় তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত কিছু কমিশনের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কাজের চেয়ে বরং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ ও কর্মসংস্থানের জন্য এসব কমিশন গঠন করা হয়েছিল, যা গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারিক কাঠামো নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকার আগামী সংসদ অধিবেশনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দেশীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘গুম প্রতিরোধ আইন’ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এতে গুমের বিভিন্ন স্তর, সাজা ও বিচারিক এখতিয়ার স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকবে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের আইনকে যুগোপযোগী করা হবে বলে জানিয়ে তিনি সতর্ক করেন যে, মানবাধিকার আইনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় সংহতির বিষয়টি কঠোরভাবে বিবেচনা করা হবে, যাতে সমাজ-স্বীকৃত নয় এমন কোনো বিতর্কিত ইস্যু দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না যায়।
মব জাস্টিস বা গণপিটুনিকে একটি ‘অপকালচার’ হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনের শাসন কার্যকর না থাকায় সমাজে এই অস্থিরতার জন্ম হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের উচ্চ ও নিম্ন আদালতের অনেকের নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় হওয়ায় বিচারপ্রার্থীরা অবিচারের শিকার হচ্ছেন। বিগত প্রহসনের নির্বাচন ও ছাত্র-জনতার ওপর নিপীড়নে বিচার বিভাগের একাংশের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দীর্ঘ ১৭ বছরের লড়াই-সংগ্রাম এবং ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, আবু সাঈদসহ অসংখ্য শহীদের রক্তস্নাত আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই বিজয় অর্জিত হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, যারা মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হওয়ার উচ্চাভিলাষে জুলাইয়ের চেতনাকে পুঁজি করছেন, তাদের অবশ্যই যুদ্ধাপরাধী বা ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে সব ধরনের গোপন যোগাযোগ ছিন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবী মহলের উদ্দেশে তিনি বলেন, অস্পষ্ট বা ভারী শব্দ ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত না করে বরং দেশের জন্য তাদের প্রকৃত রূপরেখা ও কর্মসূচি পরিষ্কার করতে হবে।
সবশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, হীন স্বার্থে কখনো ১৯৪৭ আবার কখনো ১৯৭১-কে অস্বীকার করে ২৪-এর চেতনা ব্যবহারের রাজনীতি দেশের মানুষ আর সহ্য করবে না। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, ফারুক হাসান ও অধ্যাপক নাসির উদ্দিন।
