স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন সালাহউদ্দিন আহমদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন মন্ত্রিপরিষদও গঠিত হয়েছে। এতে দলের জ্যেষ্ঠ ও ত্যাগী নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর কাছে তিনি মন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করেন। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজার জেলার তৎকালীন বৃহত্তর চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সিকদারপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তার পিতা মৌলভী ছাঈদুল হক এবং মাতা বেগম আয়েশা হক।
পেকুয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালে রেকর্ড নম্বর পেয়ে এসএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৮০ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর আইন বিভাগে। সেখান থেকে ১৯৮৪ সালে এলএলবি (সম্মান) এবং ১৯৮৬ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবী তালিকাভুক্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অ্যাডভোকেট হিসেবে সনদ লাভ করেন।
১৯৮৫ সালে ৭ম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন এবং ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। বগুড়া জেলা প্রশাসনে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে নিয়োগ পান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। কিছু সময় ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে একাধিকবার কারাবরণ করেন।
১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। এরপর ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসন থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সপ্তম ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
২০০১ সালের ১০ অক্টোবর চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। পাশাপাশি কক্সবাজার জেলার ইনচার্জ মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় দুই বছর দুই মাস তথাকথিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আমলে কারাবন্দি ছিলেন। ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ কারামুক্ত হন। ২০১০ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন।
২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার উত্তরার একটি বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে মুখোশধারী ব্যক্তিরা তাকে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘ ৬২ দিন নিখোঁজ থাকার পর ১১ মে ভারতের শিলং শহরে তাকে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরবর্তীতে সেখানেই অবস্থানকালে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন।
দীর্ঘ আইনি লড়াই ও নির্বাসন জীবন শেষে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট তার দেশে প্রত্যাবর্তন ঘটে, যা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে ‘ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি চকরিয়ায় এক নির্বাচনী সভায় সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুম করা হয়েছিল, কিন্তু জনগণের দোয়া ও আল্লাহর রহমতে তিনি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। এই জীবন তিনি দেশ ও জনগণের সেবায় উৎসর্গ করতে চান।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না বলেন, একজন অভিজ্ঞ ও যোগ্য নেতার হাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ জেলার জন্য গর্বের বিষয়।
এদিকে কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন আরাফাত বিপু বলেন, এটি পুরো জেলাবাসীর জন্য গৌরবের দিন।
ব্যক্তিগত জীবনে চার সন্তানের জনক সালাহউদ্দিন আহমদ। তার স্ত্রী হাসিনা আহমদও ২০০৮ সালের নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ ও নির্বাসনের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে আবারও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে প্রত্যাবর্তন করলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। এখন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে তার নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হয়—সেদিকেই তাকিয়ে আছে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ জনগণ।
