ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উত্তাল জাতীয় সংসদ

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে গত মঙ্গলবার ভয়াবহ উত্তাপ ও হট্টগোল হয়েছে। ব্যাংকটির সাম্প্রতিক নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন এবং এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ককে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের বাগ্বিতণ্ডায় কয়েক দফা উত্তাল হয়ে ওঠে সংসদ। মূলত ব্যাংকটির শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে হস্তান্তর এবং চলমান অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিতে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ৬৮ বিধিতে নোটিশ উত্থাপন করলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, ২০১৬ সালে মাত্র ৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে ৪৪৭ কোটি টাকার মুনাফা অর্জনকারী এই ব্যাংকটি বর্তমানে গভীর সংকটে নিমজ্জিত। তার তথ্যমতে, ২০২৪ সাল নাগাদ ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ মোট বিনিয়োগের ৫১ শতাংশে পৌঁছেছে। বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনরায় চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটিতে আবারও একটি দখলদার চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রধান উৎস এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
আলোচনার একপর্যায়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য সংক্ষেপ করতে বললে সংসদে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিরোধী উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহির পর্ষদ পুনর্গঠনের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের মালিকানাধীন নয়। একই সুরে এমপি সাইফুল আলম খান মিলন ব্যাংকটির এটিএম বুথগুলোতে নগদ অর্থের তীব্র সংকটের কথা তুলে ধরেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ধর্মীয় আবেগ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অবতারণা করেন। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক বা কোনো রাজনৈতিক দল কখনোই ‘ইসলাম’ নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী পর্ষদ পরিবর্তনের পূর্ণ ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে রয়েছে। তিনি বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, বৈধ শেয়ারহোল্ডারদের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়া আইনি কাঠামোর মাধ্যমেই সম্পন্ন করা হবে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদকে অবহিত করেন যে, ব্যাংকটির গত দুই বছরের মুনাফা ছিল মূলত ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ বা কৃত্রিম হিসাবের মারপ্যাঁচ। তিনি জানান, ২০২৫ সালের শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ৯৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ৫১ শতাংশ। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যেই ব্যাংকটিকে পরিকল্পিতভাবে ব্যর্থ করার চেষ্টা চলছে। তিনি বর্তমান সরকারের অধীনে ইসলামী ব্যাংক নিরাপদ থাকবে বলে পুনরায় আশ্বস্ত করেন।
উল্লেখ্য, নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রতিবাদে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা নবম দিনের মতো বিক্ষোভ করছেন গ্রাহকরা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত গ্রাহকরা মাত্র এক সপ্তাহে ব্যাংকটি থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন, যার মধ্যে এক দিনেই উত্তোলনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এই তারল্য সংকট সামাল দিতে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার জরুরি ঋণ সহায়তা চেয়েছে।
