ভারতীয় চলচ্চিত্রের আকাশে সুপারস্টারদের ভিড়ে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আসেন যাঁদের নামের পাশে ‘তারকা’ শব্দটা বড্ড বেমানান, কারণ তাঁরা হলেন শিল্পের প্রকৃত বরপুত্র। বৃহস্পতিবার পঁচাত্তর বছর বয়সে নানারকম অনুভূতির জাল গুটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অভিনেতা নানা পাটেকর। দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছরের বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনে গতেবাঁধা নায়কের তকমা হেলায় উড়িয়ে দিয়ে সেলুলয়েডে এক অসামান্য বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন এই প্রবীণ অভিনেতা। সাধারণ এক মারাঠি থিয়েটারকর্মী থেকে বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী মুখ হয়ে ওঠার এই পথচলা ছিল রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর, যা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে চিরকাল সোনালী অক্ষরে লেখা থাকবে।
১৯৫১ সালে এক সাধারণ মারাঠি পরিবারে জন্ম নেওয়া বিশ্বনাথ পাটেকর তথা নানা পাটেকরের অভিনয় যাত্রার শুরুটা কোনো চাকচিক্যময় গ্র্যান্ড লঞ্চ দিয়ে হয়নি। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালি পর্দায় তাঁর শান্ত আত্মপ্রকাশ ঘটে, এরপর ব্রিটিশ টেলিভিশন সিরিজ এবং আশির দশকের বেশ কিছু সিনেমায় ছোট ছোট চরিত্রে কাজ করে তিনি পরিচালক ও দর্শকদের নজর কাড়েন। তবে তাঁর অভিনয় জীবনের আসল টার্নিং পয়েন্ট আসে ১৯৮৬ সালে, যখন এন চন্দ্র পরিচালিত ‘অঙ্কুশ’ ছবিতে চার বেকার যুবকের একজনের চরিত্রে স্ক্রিন শেয়ার করেন তিনি। চোখের পলকে ক্ষোভ প্রকাশ, অনন্য সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং বিদ্যুৎগতির পারফর্ম্যান্স মুহূর্তের মধ্যে জন্ম দেয় বিখ্যাত ‘নানা টেমপ্লেট’-এর, যা পরবর্তী সময়ে হিন্দি সিনেমার ব্যাকরণ বদলে দেয়।
নব্বইয়ের দশক ছিল নানা পাটেকরের মুকুটে একের পর এক নতুন পালক যোগ করার সময়, যেখানে মিরা নায়ারের অস্কার-মনোনীত ‘সালাম বোম্বে’ কিংবা বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘পরিন্দা’ ছবির মতো কাজ তাঁকে এনে দেয় জাতীয় পুরস্কারের সম্মান। শুধুই গম্ভীর বা পার্শ্ব চরিত্রে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে ১৯৯১ সালে নিজের পরিচালিত ‘প্রহার’ ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন তিনি, যা পরবর্তীতে কাল্ট ক্লাসিকের মর্যাদা লাভ করে। রাজ কুমারের সঙ্গে ‘তিরঙ্গা’ কিংবা ১৯৯৪ সালের সুপারহিট ‘ক্রান্তিবীর’ ছবির হাত ধরে তিনি একাই বক্স অফিসের সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠেন এবং ‘ক্রান্তিবীর’-এর সেই আগুনঝরা সংলাপ আজও দর্শকের মনে প্রতিধ্বনিত হয়। শুধু সিরিয়াস চরিত্রেই নয়, ২০০৭ সালে আনিস বাজমির ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে ‘উদয় শেট্টি’ কিংবা ‘ফির হেরে ফেরি’ ছবির সুবাদে তাঁর নিখুঁত কমিক টাইমিং পপ-কালচারের অংশ হয়ে রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন ও কেরিয়ারের নানা পর্যায়ে বিতর্ক তাঁর ছায়াসঙ্গী হলেও, কাজের ধার ও প্রকাশের গভীরতায় তার প্রভাব কখনো পড়তে দেননি এই গুণী শিল্পী। ২০১০-এর দশকে ‘রাজনীতি’, ‘নটসম্রাট’ কিংবা ‘আব তক ছাপ্পান ২’ ছবির মতো নান্দনিক ও শক্তিশালী চরিত্রে তাঁর রূপায়ন বোদ্ধা মহলে দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল। ২০২৬ সালে বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত ‘ও রোমিও’ চলচ্চিত্রে একজন ছকভাঙা পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় অভিনয়ই ছিল বড় পর্দায় তাঁর জীবনের অন্তিম সৃষ্টি। এর ঠিক ছয় মাস পর গোয়ার পবিত্র মাটিতে চিরদিনের মতো চোখ বুজে সমাপ্তি টানলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক অবিস্মরণীয় ও প্রদীপ্ত অধ্যায়ের।