ট্র্যাজেডি কুইন মীনা কুমারীর জীবনের নেপথ্যে থাকা করুণ শৈশব ও সংগ্রামের গল্প

হিন্দি সিনেমার সোনালি যুগের ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ নামে খ্যাত কিংবদন্তি অভিনেত্রী মীনা কুমারী। রূপালি পর্দার সামনে যাঁর চোখের জলে ভিজেছে কোটি দর্শকের হৃদয়, সেই মানুষটির বাস্তব জীবন ছিল এক দীর্ঘ হাহাকার আর বঞ্চনার আখ্যান। আজ এই গুণী অভিনেত্রীর জন্মদিনে বিনোদনপ্রেমী মানুষেরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছেন বাংলা ও হিন্দির সেই অসামান্য প্রতিভাকে, যাঁর শৈশব কেড়ে নিয়েছিল দারিদ্র্য আর পারিবারিক নিষ্ঠুরতা। মেহজাবীন বানু থেকে মীনা কুমারী হয়ে ওঠার এই যাত্রাটি ছিল আগাগোড়া কাঁটায় মোড়ানো।
১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণকারী মীনা কুমারীর জীবনের মোড় ঘুরে যায় মাত্র চার বছর বয়সে। সংগীতশিল্পী বাবা আলী বক্সের কাছে তিনি কন্যাসন্তান হিসেবে কখনোই সাদরে গৃহীত হননি। এমনও শোনা যায়, জন্মের পর নবজাতক মীনাকে এতিমখানার দোরগোড়ায় ফেলে আসার মতো নির্মম সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করেননি তাঁর বাবা। দাদারের ঘিঞ্জি বস্তি থেকে উঠে আসা এই পরিবারের তিন মেয়েই ছিলেন বাবার কাছে অর্থ উপার্জনের যন্ত্র। বিনোদ মেহতার লেখা মীনা কুমারীর প্রামাণ্য জীবনী থেকে জানা যায়, পরিবারের অন্নসংস্থানের জন্য খুব অল্প বয়সেই তাঁকে স্টুডিও থেকে স্টুডিওতে ছুটতে হতো। সহপাঠীরা যখন শৈশবের দুরন্তপনায় মেতে থাকত, তখন ছোট্ট মীনা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয়ের জাল বুনতেন।
নিজের লেখা ও বক্তব্যে মীনা কুমারী বারবার আক্ষেপ করে বলেছেন, শৈশব শব্দটির স্বাদ তিনি কখনোই পাননি। স্কুলে যাওয়ার বদলে তিনি জীবনের পাঠ নিয়েছিলেন সিনেমার সেটে। ‘লেদার ফেস’ ছবিতে মাত্র পঁচিশ রুপি পারিশ্রমিক দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর ক্যারিয়ার ধীরে ধীরে পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। পড়াশোনার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও বাবার কঠোর শাসনে তা কখনোই পূর্ণতা পায়নি। স্টুডিওর এক কোণে বই নিয়ে বসে থাকা ছিল তাঁর একমাত্র অবসর। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত পরিবারে বড় হতে হতে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, টাকা উপার্জন করতে না পারলে তাঁর অস্তিত্বের কোনো মূল্য নেই।
পরিবারের আজ্ঞাবহ এই অভিনেত্রী জীবনে প্রথমবার স্বাধীনতার স্বাদ পেতে চেয়েছিলেন পরিচালক কামাল আমরোহীকে বিয়ে করার মাধ্যমে। বাবার অসম্মতির তোয়াক্কা না করে তিনি ঘর বেঁধেছিলেন প্রেমিকের সঙ্গে। কিন্তু বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের তিক্ততা চরমে পৌঁছায় যখন তিনি নিজের রোজগারের টাকায় কেনা বাড়ি থেকেই বাবার নির্দেশে বিতাড়িত হন। সেই সময় বাবার প্রতি লেখা তাঁর চিঠিগুলোতে ফুটে উঠেছিল এক অভিমানী মেয়ের করুণ আর্তি। সারাজীবন পরিবারের জন্য উৎসর্গ করা মানুষটি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত জীবনে একাকিত্বের চোরাবালিতেই আটকে ছিলেন।
পরিশেষে, রূপালি পর্দার পাকিজা বাস্তবেও এক দীর্ঘ বিষাদের গল্প লিখে রেখে গেছেন। ১৯৭২ সালে কালজয়ী সিনেমা ‘পাকিজা’ মুক্তির অল্প কিছুদিন পরেই লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান এই অভিনেত্রী। মৃত্যুর আগে দুই দিন কোমায় ছিলেন তিনি। রেখে গেছেন অসংখ্য কালজয়ী সিনেমা আর চোখের জলে ভেজা এক বর্ণিল অথচ করুণ জীবনকাহিনি। আজও রুপালি পর্দায় মীনা কুমারীকে দেখলে মনে পড়ে—ক্যামেরার ঝলসানি আর গ্ল্যামারের আড়ালে এক নিঃসঙ্গ শিশুর দীর্ঘশ্বাস আজও অনুরণিত হয় চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে।
