শৈল্পিক জাদুকর মুস্তাফা মনোয়ারের সৃজনশীল কর্মময় জীবন ও নান্দনিক অবদান

বাংলা টেলিভিশন এবং শিল্প-সংস্কৃতির আকাশ থেকে খসে পড়েছে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—মুস্তাফা মনোয়ার। যিনি কেবল একজন শিল্পী বা নির্মাতা ছিলেন না, ছিলেন বাঙালির রুচিবোধ আর নান্দনিকতার রূপকার। টেলিভিশনের পর্দাকে জাদুমন্ত্রে জীবন্ত করে তোলা এই মানুষটি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শিখিয়েছেন কীভাবে সৃজনশীলতার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

স্মৃতির পাতা উল্টালে আজও ভেসে ওঠে সেই সাদা-কালো টেলিভিশনের দিনগুলো, যেখানে তিনি কাগজ কেটে তৈরি করতেন চমৎকার সব খেলনা। ‘কাটুম কুটুম’ কিংবা ‘ফেলনা জিনিস খেলনা নয়’-এর মতো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি শিশু-কিশোরদের কল্পনাশক্তিকে দিয়েছিলেন নতুন ডানা। টেলিভিশনের শৈশব থেকে রঙিন পর্দার যুগ—প্রতিটি বাঁকেই মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এক বিশাল বিশেষজ্ঞ। ডিআইটির ছোট্ট স্টুডিওতে শেক্‌সপিয়ারের ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর মতো ধ্রুপদী নাটকের অবিশ্বাস্য সব মঞ্চায়ন আজও টেলিভিশন ইতিহাসের অনন্য দলিল হয়ে আছে।

তাঁর জীবনদর্শন ছিল অনন্য। ওয়াল্ট ডিজনির জন্মদিন ভুলবশত দুবার পালন করার মতো বিড়ম্বনাতেও তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন ইতিবাচকতা। তাঁর অমোঘ বাণী ছিল—‘ছোটদের কখনো ছোট মনে করবে না, কারণ তারাই একদিন দেশ গড়বে।’ শিল্পীর দৃষ্টি দিয়ে তিনি চারপাশকে দেখতেন অন্যরকম করে। আমাদের গর্বের শহীদ মিনারের পেছনে যে রক্তিম লাল বৃত্ত আমরা আজ দেখি, তা মুস্তাফা মনোয়ারেরই অনন্য সংযোজন। শুটিংয়ের সময় ক্যামেরার ফ্রেমে আসা বিশৃঙ্খল দৃশ্যপটকে ঢেকে দিতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন সেই লাল কাপড়, যা কালক্রমে শহীদ মিনারের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সূর্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

পাপেটশিল্পের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান এক কথায় কিংবদন্তিতুল্য। ‘বাঘা’ ও ‘মিনি’ চরিত্রগুলোর মাধ্যমে তিনি দেশের কথা, দশের কথা পৌঁছে দিয়েছেন প্রতিটি ঘরে। ইউনিসেফের আইকনিক কার্টুন চরিত্র ‘মীনা’ তৈরির মূল কারিগরদের একজন হিসেবে বিশ্বজুড়ে তিনি রেখেছেন তাঁর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর। খেলাধুলার মাঠে মানুষের শরীর দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা বা নকশা তৈরির সেই চমৎকার পরিকল্পনাগুলো ছিল তাঁরই সৃষ্টিশীল মস্তিষ্কের ফসল।

বিজ্ঞাপন

মুস্তাফা মনোয়ারের মহাপ্রস্থান এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টি অমর। চ্যানেল আই তাঁর সম্মানে একটি স্টুডিও উৎসর্গ করেছে, যা তাঁর স্মৃতির প্রতি এক বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর চিন্তাধারা, দেশপ্রেম এবং শিল্পের প্রতি আজীবন নিষ্ঠা নতুন প্রজন্মের কাছে চিরকাল প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর দেখানো পথ ধরে বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গন এগিয়ে যাবে আরও বহুদূর।

0%
0%
0%
0%