আসন্ন বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের ইনক্রিমেন্টে আসছে বড় পরিবর্তন

নতুন জাতীয় পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রেডভেদে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হারও পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। নতুন এই কাঠামোতে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার তুলনামূলক কম রাখা হচ্ছে।

বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সব গ্রেডেই মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। নতুন পে-স্কেলে এই অভিন্ন হার আর থাকছে না। গ্রেড যত ওপরে উঠবে, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার তত কমবে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাবেন। গ্রেড-৫-এ ইনক্রিমেন্টের হার হবে ৪ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও গ্রেড-৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হবে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও গ্রেডভিত্তিক একই ধরনের ইনক্রিমেন্ট কাঠামো রাখা হচ্ছে। ক্যাপ্টেন ও সমপদ এবং তার নিচের পদে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে।

নতুন পে-স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনা করে বেতন-ভাতা আরও যৌক্তিক করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নতুন পে-স্কেল একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পে-স্কেলটি পহেলা জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। এই পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৪ সালে চালু করা বিশেষ প্রণোদনা বাতিল হবে।

নতুন কাঠামোয় বাড়ি ভাড়া ভাতার হারেও পরিবর্তন আসছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশের পরিবর্তে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশের পরিবর্তে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং এর বাইরে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় শতাংশের হার কমলেও বাড়ি ভাতার প্রকৃত টাকার অঙ্ক গ্রেডভেদে বাড়তে পারে।

উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়মে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলে পদোন্নতি না পেলেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যে সুযোগ রয়েছে, নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে আট বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে আরও ছয় বছর চাকরির শর্ত থাকছে। পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরতরা পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুবার এ সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে পদোন্নতির সুযোগ নেই এবং ব্লকড পদ হিসেবে ঘোষিত পদে কর্মরতরা চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেড সুবিধা পাবেন।

নতুন কাঠামোয় চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হলেও নতুন নিয়মে ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সি চাকরিজীবীরা ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সিরা ৪ হাজার টাকা পাবেন। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সিরা ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সিরা ৬ হাজার টাকা মাসিক চিকিৎসা ভাতা পাবেন। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যেখানে প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি যাতায়াত ভাতা ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ থেকে ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হলেও বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোও পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। এনসি (ই) ও সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মেজর জেনারেল ও সমপদে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পেসহ কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ এবং দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো বা স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জরিপ ভাতাসহ অন্যান্য বিভিন্ন ভাতাও ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন এই কাঠামোতে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।

০%
০%
০%
০%