রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে চরম দুর্ভোগে চরবাসী

রাজশাহীতে বর্ষার আগমনে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। গত শুক্রবার সকাল ৯টায় বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ১৭.২০ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। রাজশাহীতে পদ্মার বিপৎসীমা ১৮.০৫ মিটার। বিপৎসীমার মাত্র ৮৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় এরই মধ্যে দক্ষিণ তীরের চরখিদিরপুর, খানপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিম্নভূমিতে পানি ঢুকে পড়েছে।

চরখিদিরপুরের মিডিল চরে ঘরবাড়ির উঠান ও ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়েছে। রান্নার জায়গা না থাকায় এবং গবাদিপশু রাখার নিরাপদ স্থান ও খাবারের সংকট তৈরি হওয়ায় দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বাধ্য হয়ে অনেকে সন্তান-সন্ততি ও গবাদিপশু নিয়ে নৌকায় চড়ে শহরের দিকে আসছেন। একটি নৌকায় ২৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত গরু তোলার পাশাপাশি ধান, জাল, জ্বালানি ও সংসারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে নদীপারের মানুষ চরম কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। চরের বাসিন্দা রাকিব ও মনোয়ারা বেগম জানান, তাদের ঘরবাড়ি ও চারপাশ ডুবে যাওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

শুধু রাজশাহী নয়, উজানের ঢলে চাঁপাইনবাবগঞ্জেও পদ্মার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শিবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফসলের মাঠ তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে নিরাপদ খাবার পানির।

পদ্মার এই রূপ অবশ্য সারা বছরের নয়। বর্ষা শেষ হলেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। শুষ্ক মৌসুমে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পদ্মার বুকজুড়ে জেগে ওঠে বিশাল বিশাল বালুচর। নদীর মূল প্রবাহ সংকুচিত হয়ে কোথাও সরু ধারায় পানি চলে। নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী জানান, বর্ষায় পদ্মায় পানি বেড়ে প্লাবন আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর বুক শুকিয়ে যাওয়ার এই বৈপরীত্য স্বাভাবিক নদীপ্রবাহের লক্ষণ নয়। উজানে পানি প্রত্যাহার, নদীতে পলি জমে নাব্য কমে যাওয়া এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে পদ্মার চরিত্রে এই বড় পরিবর্তন এসেছে।

পদ্মার পানির এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সঙ্গে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাব নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার নিম্নমুখী প্রবাহে পানি কমে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশে পড়ছে। যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কায় গঙ্গার পানি ভাগ হয়, যার ৩০ বছরের মেয়াদ চলতি বছরই শেষ হচ্ছে।

পদ্মার পানি কমে যাওয়ার প্রভাব কেবল নদীর বুকেই সীমাবদ্ধ নেই। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও আশপাশের বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতেও এর বড় প্রভাব পড়ছে। শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি হচ্ছে। এছাড়া নদীর শাখা-প্রশাখা ও খাল-বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে দেশি মাছ ও ইলিশ অস্তিত্বসংকটের মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফারাক্কাকে দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। উজানের বৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর গতিপথ ও পলি জমা, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন এবং নদীব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এর সঙ্গে জড়িত। নদীর তলদেশে পলি জমে ধারণক্ষমতা কমলে তুলনামূলক কম উচ্চতার পানিতেও চর এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। ফলে পদ্মাপাড়ের মানুষের জীবনে তৈরি হয়েছে এক নির্মম চক্র, যেখানে বর্ষায় পানি থেকে বাঁচতে ঘর ছাড়তে হয় আর খরায় পানির জন্য মাঠে নামতে হয়।

রাজশাহীতে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত না করে শুধু ব্যারাজ নির্মাণ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পদ্মাপাড়ের মানুষের প্রধান দাবি, বর্ষার পানি যেন দুর্ভোগের কারণ না হয় এবং খরার সময় নদী যেন মরুভূমিতে পরিণত না হয়। একটি কার্যকর আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উজান থেকে ন্যায্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, কৃষি, মৎস্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

০%
০%
০%
০%