বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আস্থা অর্জনের এক সুপরিকল্পিত প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের অঙ্গীকার থাকলেও, তার বাস্তব রূপায়ণে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব সামগ্রিক সফলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। মূলত, বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং রাজস্ব আদায়ে বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতা এখন অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাসের পাশাপাশি বিলাসপণ্য ও তামাকজাত পণ্যে কর আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাজারব্যবস্থার অসংগতির কারণে শুল্ক ছাড়ের সুফল সাধারণ ভোক্তাদের কাছে সব সময় পৌঁছায় না। বাজার সিন্ডিকেট বা অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য রুখতে না পারলে কেবল শুল্ক নীতিতে পরিবর্তন এনে পণ্যের মূল্যস্তর নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল চাবিকাঠি হলো নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা। কেবল ঋণসুবিধা বা কর ছাড় দিয়ে উদ্যোক্তা শ্রেণির উন্নয়ন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন কারিগরি প্রশিক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রাপ্তি এবং সঠিক বাজার সংযোগের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ। দুর্ভাগ্যবশত, প্রস্তাবিত বাজেটে এ ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনার অনুপস্থিতি নতুন বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে উচ্চাভিলাষী মনোভাব প্রদর্শিত হয়েছে, যা বর্তমান প্রশাসনিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সাত শতাংশের নিচে, অথচ এই অর্থনীতির আকার অনুযায়ী তা পনেরো থেকে ষোলো শতাংশ হওয়া কাম্য। রাজস্ব কাঠামোয় পরোক্ষ করের আধিক্য কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানোর জন্য আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের ব্যাংক ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে ঋণের ফাঁদে ফেলতে পারে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বজায় রাখতে হলে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সুকুক বন্ডের মতো অপ্রচলিত উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
ব্যাংক খাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি সামগ্রিক উন্নয়ন যাত্রাকে শ্লথ করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই খাতে সংস্কার না করলে অস্থিরতা আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে, মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করতে না পারলে বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
পরিশেষে বলা যায়, বাজেট কেবল রাজনৈতিক ইশতেহার পূরণের দলিল নয়, বরং এটি একটি কর্মপরিকল্পনা। সঠিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। টেকসই অর্থনীতির প্রয়োজনে এখন সব খাতের সংস্কার এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোই সরকারের প্রধান কাজ।