নতুন অর্থবছর ২০২৬-২৭-এর প্রাক্কালে সরকারের ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের কর কাঠামো ও জনসেবা খাতে নতুন যুগের সূচনা হলো। গত সোমবার জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাসের সময় করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি ও বিভিন্ন শুল্ক-কর পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছে। বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা নির্ধারণ করায় সীমিত আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ কিছুটা লাঘব হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এছাড়া সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎস কর সমন্বয় ও অনলাইন রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থাকে সহজীকরণ করার সিদ্ধান্ত করদাতাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘবে বড় ভূমিকা রাখবে।
করদাতাদের জন্য অন্যতম স্বস্তির বার্তা হলো, এখন থেকে সারা বছর অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দেওয়া যাবে। এ ব্যবস্থার ফলে সময় শেষ হওয়ার আগের তাড়াহুড়া আর থাকবে না এবং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির কারণে জরিমানার হিসাবও স্বচ্ছ থাকবে। তবে কর ফাঁকি রোধে এবং করের আওতা বাড়াতে রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা আরও কঠোর করা হয়েছে। বর্তমানে ৪১ ধরনের সরকারি-বেসরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বা পিএসআর প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা এবং নিবাসী করদাতা কোম্পানির পরিচালক হওয়ার ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র দাখিলের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সুখবর দিয়েছে এবারের বাজেট। এখন থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা অগ্রিম কর চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য হবে না। বিনিয়োগকারীরা বছর শেষে রিটার্ন দাখিল করে অতিরিক্ত করের টাকা সমন্বয় করতে পারবেন এবং করযোগ্য আয় না থাকলে রিফান্ড পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ১২০ দিনের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এ টাকা ফেরত পাওয়ার বিধান করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে টিআইএন বা কর শনাক্তকরণ নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা আগে সঞ্চয়পত্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য শিথিল ছিল।
ব্যাংকিং খাতে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য সুখবর বয়ে এনেছে আবগারি শুল্কের নতুন সীমা। এখন থেকে ব্যাংক হিসাবে চার লাখ টাকা পর্যন্ত স্থিতির ওপর কোনো আবগারি শুল্ক কাটা হবে না। এই পরিবর্তনের ফলে সাধারণ আমানতকারীরা করের বোঝা থেকে মুক্তি পাবেন। এছাড়া ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিতর্কিত প্রস্তাবটি শেষ মুহূর্তে প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা দূর করেছে।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে ব্যয় সহনীয় রাখতে নানামুখী করছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ক্যানসারসহ ছয়টি দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা সহায়তা এককালীন ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। হৃদ্রোগীদের সুবিধার্থে হার্টের রিংয়ের সরবরাহ পর্যায়ে ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা প্রতিটি রিংয়ের খরচ প্রায় ২০ হাজার টাকা কমাতে পারে। পাশাপাশি ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট ও অগ্রিম কর প্রত্যাহার করায় কিডনি রোগীদের চিকিৎসা খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।
বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কর রেয়াত পাওয়া যেত, যা এখন কমিয়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিনিয়োগের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর রেয়াত পাওয়ার নতুন নিয়মটি উচ্চবিত্ত করদাতাদের কর দায় কিছুটা বাড়িয়ে দেবে। সব মিলিয়ে এবারের বাজেটে করের আওতা বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে নাগরিক জীবনযাত্রার মান সহজ করার একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রচেষ্টার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।