দেশের শিল্প খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত নৌপথের ব্যবহার এখন নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নৌপথে বিভিন্ন সেবার মাশুল ও টোল হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির ঘোষণায় শিল্প ও সেবা খাতের পরিচালন ব্যয় ১০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকে বর্ধিত এসব মাশুল কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়েও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
গত ১১ মে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিআইডব্লিউটিএ জাহাজ পরিবহন, টার্মিনাল ও জেটি ফি এবং পণ্য খালাসসহ অর্ধশত সেবার ফি পুনর্নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০১৯ সালের পর এবারই প্রথম বড় ধরনের এ ফি পুনর্নির্ধারণ করা হলো। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি, যা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে একতরফা চাপ সৃষ্টি করেছে।
প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণে দেখা যায়, নৌপথ সংরক্ষণ বা কনজারভেন্সি চার্জসহ বিভিন্ন খাতে ফি ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেমন, মালামাল পরিবহনকারী কার্গো বা বাল্কহেডের প্রতি টনের ফি ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে। জ্বালানি তেল পরিবহনকারী ট্যাংকারের ফি প্রতি টনে ১৪৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাইলটেজ ফি, জেটি ও টার্মিনাল ব্যবহারের মাশুলও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।
সিমেন্টশিল্পের মতো নৌপথ-নির্ভর খাতগুলো এই সিদ্ধান্তের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কাঁচামাল পরিবহন ও উৎপাদিত পণ্য সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়াটিই নৌপথকেন্দ্রিক হওয়ায় সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের চড়া দামের কারণে নির্মাণ খাত আগে থেকেই চাপের মুখে রয়েছে।
বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স সমিতির সাবেক সহসভাপতি নাজমুল হোসাইন জানান, গত তিন বছরে জাহাজ পরিচালনার সার্বিক ব্যয় অন্তত ১৫ শতাংশ বেড়েছে। সরকারি এ সিদ্ধান্তের ফলে বাড়তি আরও ১০ শতাংশ ব্যয় যোগ হবে, যা এককভাবে কোনো শিল্পের পক্ষে সামলানো প্রায় অসম্ভব। বাড়তি ব্যয়ের কারণে পণ্যমূল্য সমন্বয় করতে হলে বিক্রি হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হবে, আর তা না করলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন উদ্যোক্তারা।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন নৌপরিবহনসচিব জাকারিয়া। তিনি জানিয়েছেন, পূর্বের নির্ধারিত রেটগুলো অত্যন্ত পুরোনো হওয়ায় বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে নতুন করে মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই এই ফি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো হলে বিষয়টি পর্যালোচনা করার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।