লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রতিবাদে ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী পুনরায় বন্ধ ঘোষণার পর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। সমুদ্রসীমা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই রুটে বাণিজ্যিক জাহানের সংখ্যা এক ধাক্কায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই ভঙ্গুর দ্বিপাক্ষিক শান্তি চুক্তি রক্ষার্থে সুইজারল্যান্ডে জরুরি বৈঠকে বসেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকরা।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা 'উইন্ডওয়ার্ড'-এর বিশদ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত রবিবার এই প্রণালী দিয়ে মাত্র ১২টি জাহাজ চলাচল করেছে, যার আগের দিনও এই সংখ্যা ছিল ৩৫টি। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ওই দিন প্রণালীতে প্রবেশ করা আটটি জাহাজের মধ্যে পাঁচটিরই স্বয়ংক্রিয় সনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ ছিল। উইন্ডওয়ার্ডের পক্ষ থেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি উন্মুক্ত ও সচল প্রণালীর পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞা কবলিত অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ইরানি সংশ্লিষ্টতায় পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
অথচ গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। অপর একটি জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা 'কেপলার'-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার এই রুট দিয়ে ২৫টি জাহাজ পার হয়েছিল, যা ছিল গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বোচ্চ। কিন্তু গত শনিবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং সেখানে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার অজুহাত দেখিয়ে এই জলপথ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে।
তবে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনকারী এই প্রণালী বন্ধের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই অববাহিকায় নিরাপদ জাহাজ চলাচল সচল রয়েছে এবং শনিবারও ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে এই পথ অতিক্রম করেছে। বেসরকারি ট্র্যাকিং সংস্থা এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর দেওয়া এই পরস্পরবিরোধী তথ্যের মূল কারণ অবশ্য এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
এই সংকটের স্থায়ী নিরসনে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ও ইরানি আলোচকদের মধ্যে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও চূড়ান্ত পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা শেষে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সে দেশের গণমাধ্যমকে জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষ বিস্তারিত আলোচনা করেছে এবং এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালীতে চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও সোমবার এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের প্রধান মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রায় ০.৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৮০ ডলারের নিচে নেমে আসে। একই সময়ে এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা গেছে, যার মধ্যে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ১.৮ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি ১.৫ শতাংশ এবং তাইওয়ানের তাইএক্স ২.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ০.৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।