জ্বালানির মূল্যহ্রাসে মার্কিন মূল্যস্ফীতিতে সাময়িক স্বস্তি

জ্বালানি তেলের বাজারে সাময়িক স্বস্তি ও হরমুজ প্রণালী পুনরুন্মুক্ত হওয়ার আশার মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা মূল্যস্ফীতির পারদ জুলাই মাসে কিছুটা নেমে এসেছে। তবে বার্ষিক হিসেবে দেশটির ভোক্তা মূল্যস্ফীতি এখনো বেশ উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিটির ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। মার্কিন শ্রম দপ্তরের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাই মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে ৩.৪ শতাংশ, যা নীতি নির্ধারকদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক পদক্ষেপের পর হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কঠোর সামুদ্রিক নজরদারির কারণে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন খাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক মাইকেল ক্লেইন সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা দূর হওয়ার আশায় জুলাইয়ে সাময়িকভাবে জ্বালানির দাম কমলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে তা বেড়েই চলেছে। ফলে জুলাই মাসে জ্বালানির দাম আগের মাসের তুলনায় ১.৫ শতাংশ হ্রাস পেলেও বার্ষিক ভিত্তিতে তা এখনো ১৪.৭ শতাংশ উঁচুতে অবস্থান করছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম গত সপ্তাহে ৭ শতাংশ হ্রাস পেলেও চলতি সপ্তাহে তা আবার বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৮৯.১৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। খুচরা বাজারে পেট্রলের দাম আগের মাসের তুলনায় ২.৯ শতাংশ কমলেও গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৯.১ শতাংশ বেশি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি গ্যালন পেট্রল কিনতে ভোক্তাদের গড়ে ৪.০৩ ডলার গুনতে হচ্ছে, যা সামরিক সংঘাত শুরুর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ছিল মাত্র ২.৯৮ ডলার।
জ্বালানির পাশাপাশি খাদ্যের দামও জুলাই মাসে সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে মার্কিন শ্রমবাজারের দুর্বল চিত্র অর্থনীতিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে, যেখানে গত মাসে দেশটিতে নতুন করে ২৩ হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। বিশেষ করে খুচরা ব্যবসা, শিক্ষা খাত ও স্থানীয় প্রশাসন এবং আতিথেয়তা খাতে বড় ধরনের চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে, যা নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা নির্দেশ করছে।
মূল্যস্ফীতিকে ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় নামিয়ে আনার লড়াইয়ে থাকা মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের ওপর এই দ্বিমুখী পরিস্থিতি ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। গত জুলাই মাসের নীতি নির্ধারণী বৈঠকে নীতিগত সুদহার ৩.৫০ থেকে ৩.৭৫ শতাংশের ঘরে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী নীতি নির্ধারণী বৈঠকে নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশের অধীনে সুদহার বৃদ্ধি করা হবে নাকি অপরিবর্তিত থাকবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে সিএমই ফেডওয়াচ নির্দেশ করছে যে, সুদহার অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা ৬১.৬ শতাংশ, আর তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৭৫ থেকে ৪.০০ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা ৩৮.৪ শতাংশ। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও মার্কিন শেয়ার বাজারে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে নাসডাক ০.৭ শতাংশ, এস অ্যান্ড পি ৫০০ সূচক ০.৩ শতাংশ এবং ডাও জোন্স শিল্প গড় ০.০৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দাম ১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৪,৪২৮ ডলারে পৌঁছেছে।
আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই মূল্যস্ফীতি রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তাপ ছড়াচ্ছে, কারণ নির্বাচনের আগে আর মাত্র দুটি মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। রয়টার্স ও ইপসসের সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, অর্থনীতি সামলানোর ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের নিয়ে মার্কিন নাগরিকরা প্রায় সমানভাবে বিভক্ত। জরিপে ৩৭ শতাংশ নাগরিক ডেমোক্র্যাটদের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে ৩৬ শতাংশ নাগরিকের পছন্দ রিপাবলিকান দল।
