বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসে সর্বনিম্ন বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটাতে নীতি সুদহার কমাল বাংলাদেশ ব্যাংক

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে থেকেই দেশের বেসরকারি খাতে যে মন্দা ও স্থবিরতা দানা বেঁধেছিল, তা এখনো কাটেনি। নতুন বিনিয়োগে ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তার ফলে শিল্পের চাকা সচল রাখা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকঋণের প্রবাহে, যার ফলে চলতি বছরের জুন মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসের সর্বনিম্ন। এই নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, বাজারে নতুন বিনিয়োগের গতি নেই বললেই চলে। বর্তমানে বিতরণকৃত ঋণের বড় একটি অংশ উৎপাদনমুখী খাতের পরিবর্তে মূলত ভোগ্যপণ্য আমদানি এবং ভোক্তা ঋণের খাতে ব্যয় হচ্ছে। অতীতে বেনামে ও নিয়মবহির্ভূতভাবে বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ প্রকৃত বিনিয়োগে কোনো অবদান রাখতে পারেনি। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংক তারল্য সংকট ও অস্থিতিশীলতার কারণে ঋণ বিতরণের কার্যক্রমে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
বিনিয়োগে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘ ২১ মাসের কঠোর মুদ্রানীতি থেকে সরে এসে নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যা গত রবিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, নীতি সুদহার কমলে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের ব্যয় হ্রাস পাবে, যা পর্যায়ক্রমে ঋণের সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তবে উদ্যোক্তারা মনে করেন, কেবল সুদের হার কমলেই অর্থনীতির গতি ফিরবে না; বরং গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং করকাঠামোর আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাস শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ গত মে মাসে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা জুন শেষে আরও কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে ঠেকেছে। স্মরণযোগ্য যে, ২০২০ সালে করোনা মহামারির চরম বৈশ্বিক সংকটের সময়ও দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে বজায় ছিল। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংক সমস্যাগ্রস্ত হওয়ায় ঋণ কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
অর্থনীতির চাকা সচল করতে সরকার বিভিন্ন খাতে স্বল্প সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি সোনালী ব্যাংকের ওপর আরোপিত ঋণসীমা তুলে নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় অংকের ঋণ বিতরণে সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নীতি সুদহার কমানোর পাশাপাশি এই প্রণোদনা প্যাকেজের যথাযথ ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নই অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করবে। তবে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্ক থাকার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও এ কে খান গ্রুপের পরিচালক আবুল কাসেম খান বলেন, অর্থনীতির সূচকগুলো দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মুখে রয়েছে। বর্তমান সরকার যে পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তার সুফল পেতে অন্তত দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ব্যবসায়িক নিয়মকানুন সহজীকরণ এবং নতুন প্রজন্মের জন্য ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগও বাংলাদেশে আসার পথ সুগম হবে।
