ইয়েনের দরপতন রুখতে টোকিও ও ওয়াশিংটনের যৌথ মুদ্রাবাজার হস্তক্ষেপ

জাপানের মুদ্রা ইয়েনের টানা দরপতন রোধে এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় গত সপ্তাহে এক বিরল ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েছে টোকিও ও ওয়াশিংটন। ইয়েনের বিনিময় হার গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে যাওয়ায় জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। ২০১১ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর ইয়েনের অস্বাভাবিক শক্তিশালী অবস্থান নিয়ন্ত্রণে দুই দেশ সর্বশেষ এমন কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছিল, তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং লক্ষ্য হলো দুর্বল ইয়েনকে সুরক্ষা প্রদান করা। বিবিসি ও ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যৌথ উদ্যোগ কেবল ইয়েনের দরপতন ঠেকানো নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের ভারসাম্য রক্ষায় একটি কৌশলগত বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে জাপানের অত্যন্ত কম সুদহার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ইয়েন থেকে বিমুখ করেছে, যার ফলে মুদ্রাবাজারে ইয়েনের চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায়। বর্তমানে জাপানের নীতি সুদহার ১ শতাংশে উন্নীত করা হলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদহারের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া জাপানের কর্মক্ষম জনসংখ্যা হ্রাস, উৎপাদনশীলতার স্থবিরতা এবং জ্বালানি আমদানিতে বিপুল ডলার ব্যয়ের মতো কাঠামোগত দুর্বলতা ইয়েনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েনের এই অবমূল্যায়ন অব্যাহত থাকলে জাপানের সরকারি বন্ড বিক্রির ওপর চাপ বাড়বে, যা বিশ্ববাজারে অস্থিরতা উসকে দেওয়ার পাশাপাশি মার্কিন সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়িয়ে দিতে পারে।
যৌথ হস্তক্ষেপের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক অতিমাত্রার অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজনে এমন যৌথ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, জাপানের মুদ্রার মান রক্ষায় ওয়াশিংটন সর্বদা পাশে থাকবে। এই প্রতিক্রিয়ার পর ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের বাজারে টোকিও এককভাবে প্রায় ৫৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে ইয়েন কিনেছিল এবং শুক্রবার ওয়াশিংটনের সাথে যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাজারের অস্থিরতা অনেকটা প্রশমিত করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী পরিমাণ ইয়েন কিনেছে তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে বিভিন্ন সূত্রে ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের ইয়েন কেনা হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ইয়েন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘকাল ধরে স্বল্প সুদে ইয়েনে ঋণ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শেয়ার ও বন্ডে বিনিয়োগ করে আসছেন, যা বৈশ্বিক মূলধন প্রবাহের একটি অন্যতম উৎস। ইয়েনের বিনিময় হারের আকস্মিক পরিবর্তন শুধু জাপানি অর্থনীতির জন্য নয়, পুরো আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কারণে ইয়েন হঠাৎ শক্তিশালী হলে বিনিয়োগকারীরা বিদেশি সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধে মরিয়া হয়ে ওঠেন, যা শেয়ার ও বন্ডবাজারে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে। এই জটিল প্রেক্ষাপটে ইয়েন কেবল একটি মুদ্রা নয়, বরং বিশ্ববাজারে ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার একটি প্রধান নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
