জ্বালানি তেলের রেকর্ড মুনাফা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কর আরোপের দাবি

ইরানে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখী দরের সুযোগে বড় তেল কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই জ্বালানি জায়ান্ট এক্সনমোবিল ও শেভরন সম্মিলিতভাবে ২৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার নিট মুনাফা করেছে। রেকর্ড এই মুনাফা অর্জনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে, কারণ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয়ের চাপে সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে শেভরনের মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১২ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৯৬০ কোটি ডলার বেশি। একই সময়ে এক্সনমোবিলের মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলারে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ব্রিটিশ জ্বালানি কোম্পানি শেলও তাদের দ্বিতীয় প্রান্তিকের মুনাফা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তেল কোম্পানিগুলোর এই আকাশচুম্বী মুনাফার পেছনে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সংকটকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল, যা বর্তমানে ৯০ ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল রয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সম্পন্ন হয়।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিপুল মুনাফা করা সত্ত্বেও তেল কোম্পানিগুলো নতুন খনন প্রকল্পে বিনিয়োগে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, ভূ-রাজনৈতিক সংকটের অবসান ঘটলে তেলের দাম দ্রুত হ্রাস পেতে পারে, যা নতুন বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা প্রাপ্তিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর চড়া থাকলে চলতি বছর বৈশ্বিক তেল খাতের অতিরিক্ত মুনাফা ৪২৫ বিলিয়ন বা ৪২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের গড় মূল্য গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে বাড়ছে তীব্র অসন্তোষ। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা তেল কোম্পানিগুলোর ওপর বিশেষ করারোপের দাবি তুলেছেন। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও শেলডন হোয়াইটহাউস যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে প্রতিনিধি ব্র্যাড শারম্যান অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর আরোপ করে সেই অর্থ জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তবে তেলশিল্পের নীতিনির্ধারকরা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডাস্টিন মেয়ার জানান, বৈশ্বিক তেলবাজার অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং এখানে মূল্য কারসাজির কোনো অবকাশ নেই। এক্সনমোবিল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ও পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ৭১ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের সতর্কবার্তা হলো, নতুন করে অতিরিক্ত মুনাফার ওপর করারোপ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন নিরুৎসাহিত হতে পারে। ১৯৮০ সালের অনুরূপ পদক্ষেপ থেকে সে সময় প্রত্যাশিত রাজস্ব না আসায় নতুন করে কর আরোপের যৌক্তিকতা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, জ্বালানি তেলের মূল্য এবং বৃহৎ কোম্পানিগুলোর মুনাফা নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়বে।
