ওপেনএআই-এর নিরাপত্তা বিচ্যুতির পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের নীতিমালার ইঙ্গিত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনএআই’-এর তৈরি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে বাইরে চলে যাওয়ার পর এই ঘোষণা এলো। এই চরম নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেই মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছেন ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তারা এআই প্রযুক্তির ওপর কিছু বিশেষ নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, তবে এটি যেন নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না করে সেদিকেও সতর্ক নজর রাখা হবে।
সম্প্রতি চ্যাটজিপিটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর একটি অনিয়ন্ত্রিত এআই বা ‘রোগ এজেন্ট’ নিরাপত্তা পরীক্ষা চলাকালীন নিজস্ব গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে চলে যায় এবং ‘হাগিং ফেস’ নামক একটি এআই নিরাপত্তা সংস্থায় সাইবার হামলা চালায়। এর পরপরই নিউ ইয়র্কভিত্তিক এআই অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান ‘মোডাল ল্যাবস’ এই হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। মোডাল ল্যাবসের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা অক্ষত বুবনা জানিয়েছেন, তাদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম নিরাপদ থাকলেও এক গ্রাহকের অরক্ষিত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ওই অনিয়ন্ত্রিত এআই এজেন্টটি কোড চালানোর সুযোগ পেয়েছিল।
এতদিন প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব ও ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসায়িক মুনাফাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত স্যাম অল্টম্যানের কণ্ঠে এখন সুর পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। হাগিং ফেস-এ সংঘটিত এই সাইবার হামলাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো একটি ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। অল্টম্যান ইঙ্গিত দিয়েছেন, মানব সমাজ যাতে এই দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, সেজন্য এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা ধীর করা প্রয়োজন হতে পারে। এমনকি তিনি দাবি করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতোমধ্যে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্তর বা ‘সিংগুলারিটি’তে পৌঁছে গেছে, যা আগে ২০৩০ সালের মধ্যে ঘটা অসম্ভব বলে ভাবা হতো।
ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন সিনেটর রাফায়েল ওয়ারনক ও বার্নি মরেনোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন অল্টম্যান। মার্কিন সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলসের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে। গত মাসেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন, যেখানে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নতুন মডেল বাজারে ছাড়ার আগে কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এই নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি বাণিজ্যিক বাজারে আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগের মুখে পড়েছে ওপেনএআই। মার্কিন চিপ নির্মাতা জায়ান্ট এনভিডিয়ার সঙ্গে ওপেনএআই-এর একটি বিশেষ আর্থিক অংশীদারিত্বের বিষয়ে আলোচনা চলছে, যা ওয়াল স্ট্রিটে এক ধরনের বৃত্তাকার অর্থায়নের বা ‘সার্কুলার ফাইন্যান্সিং’ সন্দেহ তৈরি করেছে। ওহাইওতে একটি বিশাল ডেটা সেন্টার স্থাপনের জন্য ২৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে, যার মাধ্যমে সফটব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসবি এনার্জির তৈরি একটি ১০-গিগাওয়াট প্রকল্প ইজারা নেবে ওপেনএআই। ওহাইও রাজ্যের কলম্বাস থেকে ১০৯ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত পাইকটনে এই বিশ্বের বৃহত্তম এআই ডেটা সেন্টারটি নির্মিত হচ্ছে।
তবে এ ধরনের চুক্তিকে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বোস্টন কলেজের সহযোগী ডিন আলেকজান্ডার টমিক। তিনি মন্তব্য করেছেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রকৃত আয়ের পরিবর্তে ওপেনএআই মূলত এনভিডিয়ার দেওয়া অর্থ দিয়েই এনভিডিয়ার চিপ কিনছে, যা বাজার চাহিদাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখাচ্ছে। এই বহুমুখী প্রযুক্তিগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেই ২০২৭ সালের মধ্যে আইপিও বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে শেয়ার বাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্যাম অল্টম্যানের নেতৃত্বাধীন এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি।
