নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের চাপে বিপর্যস্ত ইরান অর্থনীতি সচল থাকলেও বাড়ছে দারিদ্র্য ও জনদুর্ভোগ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ মাসের সামরিক উত্তেজনা ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েও ইরান তার রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে ধস থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই টিকে থাকার লড়াইয়ের মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে, যারা বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার গোলকধাঁধায় বন্দি। ৯ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে একদিকে তেলের বৈশ্বিক বাজারে একচেটিয়া প্রভাব ধরে রাখা, অন্যদিকে কৃষি ও উৎপাদনশিল্পের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে অর্থনীতি সচল রাখার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু এই কাঠামোগত স্থিতিশীলতার আড়ালে মুদ্রাস্ফীতি ও দারিদ্র্যের যে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে, তা মধ্যবিত্ত শ্রেণির অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলো এখন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছানোয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন মাংস, ডিম ও ভোজ্যতেলের দাম গত এক বছরে তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সাধারণ মানুষের মজুরি সেই অনুপাতে বাড়েনি, বরং মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসায় ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছে। মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন আমদানিনির্ভর পণ্যের দামকে সাধারণের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে, যার ফলে পরিবারগুলোর ওপর চাপের পাহাড় জমছে।

সরকারি তথ্য ও স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনগুলোতে অর্থনীতির এই ভঙ্গুর চিত্র আরও স্পষ্ট। ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, ইরানের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে সরকারি সেবার মান হ্রাস পাওয়া, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খোদ সরকারের পক্ষ থেকেই স্বীকার করা হয়েছে যে, তেল রপ্তানি বাবদ অর্জিত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের হিসাব নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বিদ্যমান রাজনৈতিক দুর্নীতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক আনুগত্য ও রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনৈতিক মডেল বেসরকারি খাতের বিকাশকে রুদ্ধ করে দিয়েছে, ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া তো দূরের কথা, মেধাবী তরুণদের দেশত্যাগের প্রবণতা বাড়ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই বিলুপ্তি এবং জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের দারিদ্র্যসীমার আশপাশে অবস্থান আগামী দিনে দেশটির সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

ইরানের জন্য এই সংকট থেকে উত্তরণের পথটি কেবল অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর নির্ভর করছে না। ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমানোর জন্য কূটনৈতিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও চীন, রাশিয়া ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া সম্ভব, কিন্তু প্রকৃত অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূলধারায় ফেরা জরুরি। রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকে থাকার লড়াইয়ে অর্থনীতি আপাতত ধসে না পড়লেও, দীর্ঘমেয়াদী এই স্থবিরতা দেশটির সামাজিক কাঠামোয় যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে, তা থেকে উত্তরণ অত্যন্ত কঠিন হবে।

0%
0%
0%
0%