AdvertisementAdvertisement

ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতে বিদেশি মালিকানা বাড়লে দেশীয় শিল্পের অস্তিত্ব ও অর্থনীতি সংকটের ঝুঁকি

লজিস্টিক ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতে বিদেশি যৌথ মালিকানার কোম্পানির জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত ‘লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা সতর্ক করেন যে, কোনো প্রকার উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ছাড়াই বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল মুনাফা নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছে, যা দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিকাশের পথ রুদ্ধ করছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বর্তমানে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে যৌথ মালিকানার ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ সীমা ৪০ শতাংশ থাকলেও, খসড়ায় তা ৫১ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে সরকার এই খাতের লাইসেন্স প্রদানে বিদেশি মালিকানার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, যা এখন শিথিল করার প্রক্রিয়া চললে তা দেশীয় বাণিজ্যের সুরক্ষার জন্য হুমকিস্বরূপ হবে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

আলোচনায় উঠে আসে যে, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং একটি স্বল্প সম্পদভিত্তিক সেবাশিল্প, যেখানে প্রবেশে প্রকৃত মূলধনি ব্যয় প্রায় শূন্য। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে যে অর্থের প্রবাহ দেখানো হয়, তা মূলত অফিস পরিচালনার ব্যয়, কোনো প্রকৃত বিনিয়োগ নয়। এই প্রেক্ষিতে সাকিব আনোয়ার ছয়টি সুপারিশ উত্থাপন করেন, যার মধ্যে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, শিপিং এজেন্সি, সিঅ্যান্ডএফ এবং কুরিয়ার এক্সপ্রেস—এই চারটি উপখাতে অভিন্ন ৬০: ৪০ ইকুইটি কাঠামো বজায় রাখা এবং লভ্যাংশ ও পর্ষদের ভোটাধিকারে দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আরিফুল আহসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংগঠনের ১ হাজার ২৫০ জন সদস্যের মধ্যে হাতেগোনা কিছু বিদেশি ও যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দেশের বাজারের ৮০ শতাংশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো স্থায়ী বিনিয়োগ নেই এবং অর্জিত মুনাফা তারা নির্বিঘ্নে বিদেশে পাচার করছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি কোম্পানিকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?

Advertisement
বিজ্ঞাপন

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা ও গভীর আলোচনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বিদেশি অংশীদারিত্বের সীমা বাড়ানো অত্যন্ত বিস্ময়কর। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সংসদ সদস্য ফজল হুদা ভারত ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো দেশীয় কোম্পানিকে সুরক্ষা দিতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর নীতি অনুসরণ করে। অথচ বাংলাদেশে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের মতো স্পর্শকাতর খাতে বিদেশিদের অবাধ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, বিনিয়োগ আর বাণিজ্য এক বিষয় নয়। যদি বিনিয়োগ আনতে হয়, তবে অবকাঠামো খাতে আনতে হবে, কেবল কাগজী বাণিজ্যে নয়। লজিস্টিকস খাতের এই নীতি সংস্কার শুধুমাত্র একটি শিল্পের বিষয় নয়, বরং এটি দেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানি ও সামগ্রিক সরবরাহ চেইন সুরক্ষার প্রশ্ন। তাই সরকারের নীতিনির্ধারকদের উচিত দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান তৈরির স্বার্থে কঠোর সুরক্ষানীতি গ্রহণ করা।

0%
0%
0%
0%