ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় নিরাপদ বিনিয়োগের চিরাচরিত ধারণা পাল্টাচ্ছে সোনার বাজার

ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের চিরাচরিত ধারণা বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে সোনার যে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে। বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ কৌশল হিসেবে সোনা এখন নিছক মুনাফার উৎস না হয়ে কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করছে।

বিজ্ঞাপন

দ্য ন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান যুদ্ধের উত্তেজনার সময় প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৫ হাজার ২৭৮ ডলার। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাজার অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জুন মাসে সোনার দাম ১২ দশমিক ৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা ২০০৮ সালের পর থেকে যেকোনো মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ দরপতন। মার্কিন ডলারের শক্তি বৃদ্ধি এবং ফেডারেল রিজার্ভের উচ্চ সুদহারের নীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ ট্রেজারি সিকিউরিটিজের দিকে ঝুঁকে পড়ায় সোনার বাজারে এই চাপ তৈরি হয়েছে।

দুবাইভিত্তিক ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ইকুইটি গ্রুপের মার্কেট ইনসাইটস প্রধান নুরেলদিন আল হাম্মুরি মনে করেন, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকট মানেই সোনার দাম বাড়ার পুরোনো সমীকরণটি এখন আর কার্যকর নয়। স্বল্প মেয়াদে নগদ অর্থ ও সরকারি বন্ডের বিপরীতে সোনার তীব্র প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। বন্ডের মাধ্যমে নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া সম্ভব হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, কারণ সোনা থেকে কোনো সুদ পাওয়া যায় না।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল তাদের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে যে, বছরের প্রথমার্ধে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের আকস্মিক পরিবর্তন সোনার দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাসে তারা আশাবাদী। জে পি মরগ্যান জানিয়েছে, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে সোনার দাম ৪ হাজার ৫০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। বাজারের বর্তমান দরপতন রোধে কম দামে সোনা কেনার প্রবণতা বড় ভূমিকা পালন করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।

বিজ্ঞাপন

টিয়ারা জেমস অ্যান্ড জুয়েলারির প্রতিষ্ঠাতা আশীষ বিজয় মন্তব্য করেন যে, সোনা এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য কেবল একটি বাজারের পণ্য নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী সার্বভৌম সুরক্ষা কবচ হয়ে উঠছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক সোনা কেনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সোনার আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সোনাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে।

বর্তমানে সোনার চাহিদার কেন্দ্রবিন্দু ক্রমান্বয়ে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে পূর্বের দিকে সরে যাচ্ছে। লন্ডন বা নিউইয়র্কভিত্তিক পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা স্বল্পমেয়াদী মুনাফার পেছনে ছুটলেও চীন ও ভারতের মতো এশীয় দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সোনা কিনছে। বিশেষ করে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা ১৯ মাস ধরে তাদের সোনার মজুত বৃদ্ধি করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের অস্থির কেনাবেচা স্বল্পমেয়াদে দামের ওপর প্রভাব ফেললেও, দীর্ঘমেয়াদী দামের গতিপথ নির্ধারণে এশিয়ার ক্রেতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কৌশলী অবস্থানই এখন মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

0%
0%
0%
0%