চট্টগ্রাম বন্দরে রাজস্ব আয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল

দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে সরকারি রাজস্ব আদায়ে নতুন রেকর্ড স্থাপিত হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরটি দিয়ে সোয়া ১১ কোটি টন পণ্য পরিবাহিত হয়েছে, যার সম্মিলিত শুল্কায়িত মূল্য ছাড়িয়েছে ১১ লাখ কোটি টাকা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ থেকে সরকারি কোষাগার ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ঘরে জমা হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বন্দরটির এই ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী অবস্থানের চিত্রই ফুটে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

বিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১০ কোটি ৭৫ লাখ টন আমদানি পণ্য খালাস হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। এসব পণ্যের বিপরীতে চট্টগ্রাম কাস্টমস, কমলাপুর আইসিডি, পানগাঁও টার্মিনাল এবং চট্টগ্রাম ইপিজেড কাস্টমস স্টেশনগুলোর মাধ্যমে সরকার প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করেছে। পূর্ববর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় আমদানিকৃত পণ্যের রাজস্ব আদায়ের এই হার প্রায় ১০ শতাংশ বেশি, যা দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি চাহিদার প্রতিফলন ঘটায়।

রপ্তানি বাণিজ্যেও প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বন্দর দিয়ে ৪৯ লাখ টন রপ্তানি পণ্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। যদিও রপ্তানি পণ্যের সিংহভাগ শুল্কমুক্ত হওয়ায় এই খাত থেকে সরাসরি রাজস্ব আহরণের পরিমাণ তুলনামূলক কম, তবুও বাণিজ্যের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের উৎপাদনমুখী খাতের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একক রাজস্ব আয়ে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশের পর আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

শুধুমাত্র শুল্ক ও করের বাইরেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব পরিচালন আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কনটেইনার ও বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিং মিলিয়ে বিদায়ী অর্থবছরে বন্দর কর্তৃপক্ষের আয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি। পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সময়োপযোগী ট্যারিফ সমন্বয়ের ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের আর্থিক সক্ষমতাকে আরও সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছে। বন্দরের এই আয় মূলত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করা হয়।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশাল অর্থনৈতিক বলয় কেবল সরকারি রাজস্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বন্দরের কার্যক্রমে সহায়তা প্রদানকারী ২০টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো, টার্মিনাল অপারেটর, শিপিং লাইন, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার এবং পরিবহন খাতের হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান ও শ্রমজীবী মানুষ এই বন্দরের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। যদিও এসব সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আর্থিক লেনদেনের কোনো কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান নেই, তবে সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদদের ধারণা, সরকারি খাতের বাইরেও বন্দরকে ঘিরে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

0%
0%
0%
0%