ইউরোপীয় বাজারে চীনা পণ্যের আধিপত্য রোধ ও দেশীয় শিল্প রক্ষায় ব্রাসেলসে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক

ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাণিজ্য কমিশনার মারোস সেফকোভিচ এবং চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাওয়ের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে উষ্ণ সৌহার্দ্যপূর্ণ মনে হলেও, এই বৈঠকের নেপথ্যে ছিল ইউরোপীয় বাজারে চীনা পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ঠেকানোর কঠোর বার্তা। ইইউর পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমান একতরফা বাণিজ্য ঘাটতি কোনোভাবেই আর মেনে নেওয়া হবে না এবং ইউরোপীয় নিজস্ব শিল্প রক্ষায় তারা কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্যের প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত ইউরোপ এখন তাদের অভ্যন্তরীণ বাজার রক্ষায় সুরক্ষাবাদী নীতি গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে। ২০২৫ সালে ইইউর সাথে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৩৬০.৬ বিলিয়ন ইউরোতে, যা প্রায় ৪১১ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য এবং আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। সৌর প্যানেল, বিরল খনিজ, রাসায়নিক এবং শিল্প রোবটের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে এখন চীনা কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়েছে, যা ইউরোপীয় নীয়মনীতি প্রণেতাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
বিশেষ করে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী স্বয়ংচালিত খাতে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির আগ্রাসন তীব্র রূপ নিয়েছে। চীনের তৈরি বিওয়াইডি, গিলি বা চেরির মতো ব্র্যান্ডগুলোর বাজার সম্প্রসারণ রুখতে ইইউ আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ৩৫.৩ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না। ডেটাফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ইউরোপের মোট গাড়ি বিক্রির ১০ শতাংশেরও বেশি ছিল চীনা ব্র্যান্ডের দখলে, যার ফলে খোদ ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় গাড়ি নির্মাতারা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
এই তীব্র প্রতিযোগিতার জেরে জার্মানির বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগেন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রায় ১ লাখ কর্মসংস্থান ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে, যা তাদের মোট জনবলের ১৫ শতাংশ। একই সঙ্গে বিলাসবহুল ব্র্যান্ড বিএমডব্লিউ ২০২৬ সালের মধ্যে ৫ শতাংশ কর্মী কমানোর ঘোষণা দিয়েছে এবং মার্সিডিজ-বেঞ্জ তাদের কর্মীদের বোনাস স্থগিতসহ ঐচ্ছিক অবসরের প্রস্তাব দিচ্ছে। ফরাসি ব্যবসায়িক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এসেক বিজনেস স্কুলের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ফিলিপ লে করে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য এটি এখন বাস্তব হুমকি এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় নিজস্ব নীতি প্রণয়ন করা ছাড়া ইইউর সামনে অন্য কোনো পথ নেই।
চীনা পণ্যের একচেটিয়া আধিপত্য ঠেকাতে ইইউ বেশ কিছু প্রতিরোধমূলক আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে চীনা প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করতে সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধন, সরকারি কেনাকাটায় ইউরোপীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দিতে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সিলারেটর অ্যাক্ট’ প্রণয়ন এবং সংবেদনশীল খাতে অন্তত তিনটি ভিন্ন দেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানির বাধ্যবাধকতা। এ ছাড়া আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন নিয়মে আমদানিকৃত ইস্পাতের শুল্কমুক্ত কোটা হ্রাস এবং ছোট পার্সেলের ওপর ৩ ইউরো বা ৩.৪২ ডলার শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বেইজিং তাদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং পাল্টা বাণিজ্যিক ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হ্যান্ডেল ‘ইউইউয়ানতানতিয়ান’ সতর্ক করে বলেছে যে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক চরম অবনতির দিকে গেলেও তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা চীনের রয়েছে। তবে সোমবারের বৈঠকের পর সেফকোভিচ এই আলোচনাকে ‘গঠনমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং আগামী অক্টোবর মাসে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য চারটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন।
হংকংভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান নাটিক্সিসের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো মনে করেন, ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কায় ইউরোপীয় নেতারা কেবল লোকদেখানো কোনো সমঝোতায় সন্তুষ্ট হবেন না। ইউরোপের লক্ষ্য থাকবে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধ এড়িয়ে চীনকে যৌক্তিক ছাড় দিতে বাধ্য করা। তবে শেষ পর্যন্ত বেইজিং ইউরোপের নিজস্ব শিল্প রক্ষার এই কঠোর অবস্থানকে কীভাবে গ্রহণ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ।