ব্যাংক খাতের চরম সংকট ও সংস্কারহীন বাজেট দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত

দেশের অর্থনীতির আকার ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির নতুন এই রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও, খোদ অর্থমন্ত্রীর উপস্থাপিত তথ্যই দেশের ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর ও সংকটাপন্ন পরিস্থিতির নগ্ন চিত্র তুলে ধরেছে। জিডিপির ৫০ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণকারী এই খাতটি বর্তমানে এতটাই নড়বড়ে যে, খাতের স্থিতিশীলতা ছাড়া সরকারের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
বাজেট তথ্যানুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে আসা এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে ঠেকে যাওয়া গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের ৪৬ শতাংশ নির্ভরতা ব্যাংক খাতের ওপর থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। বর্তমানে মোট জিডিপিতে বেসরকারি ঋণের অবদান মাত্র ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা গত এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ-এর অর্থনীতিবিদ লুক লেভেন ও ফাবিয়ান ভ্যালেন্সিয়ার গবেষণা অনুযায়ী, মোট ঋণের ২০ শতাংশের বেশি খেলাপি হওয়া বা ব্যাংক খাত বাঁচাতে জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি ব্যয় হওয়া পদ্ধতিগত সংকটের লক্ষণ। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সেই মানদণ্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংক খাত সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে টাকা ছাপিয়ে বিভিন্ন ব্যাংককে ৬৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ধার দিয়েছে, যার বড় অংশই পরিশোধিত হয়নি। ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের অস্থিরতা এবং তারল্য সংকট পুরো আর্থিক খাতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের ‘লস্ট ডিকেড’ বা হারানো দশকের মতো দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থবিরতা এড়াতে দ্রুত ব্যাংকিং সংস্কার অপরিহার্য। যদিও নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের অঙ্গীকার ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক বাজেটে ব্যাংক খাত সংস্কারের সুনির্দিষ্ট কাঠামো বা সময়সীমার উল্লেখ নেই। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পূর্ণ পেশাদার ও নিরপেক্ষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হস্তক্ষেপে বিলম্ব হলে সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যয় ও ক্ষতির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বাড়বে। গত ৩০ বছরে একাধিকবার ব্যাংক কমিশন গঠনের কথা বলা হলেও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বাধায় তা আলোর মুখ দেখেনি। অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, দক্ষ ও নির্মোহ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে শক্তিশালী কমিশন গঠন করে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার শুরু করা না গেলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকারের এখনকার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাংক খাতকে রাজনীতিমুক্ত করে এর হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা।