নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা নিয়ে নৌ মন্ত্রণালয়ের পরস্পরবিরোধী নির্দেশনায় ধোঁয়াশা

চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান চালিকাশক্তি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটিকে কেন্দ্র করে সরকারি নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। একই দিনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো দুটি পরস্পরবিরোধী চিঠি এই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকালে পাঠানো প্রথম চিঠিতে দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চলমান ইজারা প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা অথবা তা বাতিল করার কথা বলা হয়। তবে একই দিন বিকেলে মন্ত্রণালয়ের পাঠানো দ্বিতীয় চিঠিতে আগের নির্দেশনার বিপরীত অবস্থান নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে দর-কষাকষি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

এই দুই চিঠির ঘটনায় বন্দর সংশ্লিষ্ট মহল ও অংশীজনদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে যে, এনসিটি ইজারা নিয়ে সরকারের প্রকৃত অবস্থান কী। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া এ প্রসঙ্গে জানান, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের মতামতের ভিত্তিতে প্রথম চিঠিটি দেওয়া হয়েছিল, আর দ্বিতীয় চিঠিটি ছিল বন্দরের চাহিদার প্রেক্ষিতে আলোচনার ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্দেশনা। বর্তমানে সরকারি সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা চলমান রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থানের পরদিন শুক্রবারই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সাত সদস্যের একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। বন্দরে হ্যান্ডল হওয়া মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ এই এনসিটি টার্মিনালের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। বর্তমানে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড টার্মিনালটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করছে এবং ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড ভঙ্গ করছে। গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ ২৬ হাজার একক কনটেইনার পরিবহনের মাধ্যমে নতুন সক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনার পাশাপাশি দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ এনসিটি পরিচালনার জন্য নতুন প্রস্তাব জমা দিয়েছে। তারা দাবি করছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে প্রতি কনটেইনারে ৫ ডলার বেশি রাজস্ব দিতে সক্ষম তারা। তবে মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, বর্তমানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সমঝোতা প্রক্রিয়া চলমান থাকায় অন্য কোনো প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনার সুযোগ নেই। যদি আলোচনার মাধ্যমে কোনো সুরাহা না হয়, তবেই নতুন করে দরপত্র আহ্বানের বিষয়টি সক্রিয় হবে।

বিজ্ঞাপন

এনসিটি পরিচালনা নিয়ে বর্তমানে দুটি বিপরীতমুখী মত রয়েছে। দেশীয় অপারেটরদের একটি বড় অংশ মনে করে, লাভজনক এই টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই; বরং নতুন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা যেতে পারে। অন্যদিকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অপর অংশ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পক্ষে। এখন দেখার বিষয়, রেকর্ড গড়া এই টার্মিনাল দেশীয় ব্যবস্থাপনায় থাকে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চুক্তির মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ন্যস্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তই চট্টগ্রাম বন্দরের পরবর্তী বাণিজ্যিক পথচলা ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে।

0%
0%
0%
0%