তামাক ছেড়ে চায়ের চাষে লালমনিরহাটের কৃষকের ভাগ্যবদলের স্বপ্ন

লালমনিরহাট জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে চা চাষ। ক্ষতিকারক তামাকের বিকল্প এবং অধিক লাভজনক ফসল হিসেবে চা চাষাবাদ এখন স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। জেলার আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের তালুক দুলালি মৌজায় ২০১৬ সালে আইনজীবী জামাল উদ্দিন সরকারের হাত ধরে পরীক্ষামূলকভাবে যে চা চাষের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ জেলার পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা ও কালিগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে।
২০০৭ সালে সরকারের গৃহীত ‘ইরাডিকেশন অব রুরাল পভার্টি বাই এক্সটেনশন অব স্মল হোল্ডিং টি কাল্টিভেশন ইন লালমনিরহাট’ প্রকল্পের আওতায় ১০০ হেক্টর জমিতে চা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। নর্দার্ন টি বেল্টের আওতায় চা বোর্ড এখানে কার্যালয় স্থাপন করলেও করোনার সময় শ্রমিক সংকট ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিরা কিছুটা হোঁচট খান। বিশেষ করে নিজস্ব পারচেজ হাউস না থাকায় পঞ্চগড়ে চা পাতা পাঠাতে গিয়ে চাষিরা পরিবহন খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ক্ষতির মুখে পড়তেন, যা অনেকের মনে ভীতি তৈরি করেছিল।
তবে বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি সবুজ চা পাতা ৩৮ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় চাষিদের মুখে নতুন করে হাসি ফুটেছে। কৃষিবিদদের মতে, চা চাষে ঝুঁকি কম এবং মুনাফার হার বেশি। বছরে সাতবার পাতা তোলা যায় এবং প্রতি বিঘা জমি থেকে বছরে প্রায় তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নিট মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। সার, কীটনাশক ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি চা পাতায় ১১ থেকে ১৩ টাকা ব্যয় হলেও বর্তমান মূল্যে তা অত্যন্ত লাভজনক বলে বিবেচিত হচ্ছে।
উদ্যোক্তা জামাল উদ্দিন ও স্থানীয় চা চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, সারের অভাব ও চা বোর্ডের সহযোগিতার অভাবে চাষিরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। ভুট্টা বা ধান চাষিরা রেশনিং পদ্ধতিতে সার পেলেও চা চাষিরা তা থেকে বঞ্চিত। তিন বছর ধরে চা বোর্ডের প্রকল্প স্থবির থাকায় চারা সরবরাহ, যন্ত্রপাতি ও প্রণোদনা বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে চাষিদের বাধ্য হয়ে কালোবাজারি থেকে দ্বিগুণ দামে সার কিনতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট চা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমির হোসেন জানান, দীর্ঘ সময় নতুন প্রকল্প না থাকায় এবং মাঠ পর্যায়ে লোকবল ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার সংকটের কারণে চাষিদের পূর্ণাঙ্গ সেবা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। তবে গত বছর জেলায় চার লাখ ২৮ হাজার ৬৪১ কেজি সবুজ চা পাতা উৎপাদিত হয়েছে, যা জেলার অপার সম্ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ। স্থানীয় চাষিরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত সার সরবরাহের মাধ্যমে এ শিল্পকে আরও বিকশিত করার দাবি জানিয়েছেন।
