গারো পাহাড়ে মানুষ ও হাতির প্রাণঘাতী সংঘাত বাড়ছেই ১২ বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৪ জন

ময়মনসিংহের গারো পাহাড় অঞ্চলে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ বিপর্যস্ত হওয়ায় খাদ্য ও পানির সন্ধানে লোকালয়ে নেমে আসছে বুনো হাতির দল। এতে একদিকে যেমন কৃষকের ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে হাতি ও মানুষের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘাত দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত ১২ বছরে এই সংঘাতে ৪৯ জন মানুষ নিহত হয়েছেন এবং মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও বিষটোপে প্রাণ হারিয়েছে ৩৫টি বন্য হাতি।
বন উজাড়, নির্বিচারে পাহাড় কাটা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ খাদ্য সংকটকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা। এক সময়ের ঘন অরণ্যে আমলকী, হরিতকী, বহেড়া ও বুনো কলার মতো হাতির প্রিয় খাদ্যের প্রাকৃতিক উৎসগুলো এখন প্রায় বিলুপ্ত। সেই সাথে পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়াগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় তৃষ্ণার্ত হাতির দল বাধ্য হয়ে রাতের অন্ধকারে সমতলে নেমে আসছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শেরপুর জেলা, যেখানে হাতির আক্রমণে ৩০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং সমসংখ্যক হাতি মারা পড়েছে। এছাড়া ময়মনসিংহ জেলায় ১০ জন, নেত্রকোনায় ৫ জন এবং জামালপুরে ৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, নিজেদের একমাত্র সম্বল ফসল রক্ষায় তারা বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, যার মর্মান্তিক পরিণতিতে প্রাণ ঝরছে উভয় পক্ষেরই।
প্রাণীবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ১৪০ থেকে ২৭০ কেজি খাদ্য এবং ২০০ থেকে ৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়, যা বর্তমানের সংকুচিত বনভূমিতে মেটানো অসম্ভব। ড. রোকোনুজ্জামান জানান, বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় এই সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। পরিবেশের এই বিপর্যয় রোধে ও বন্যপ্রাণীর আবাসন নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট।
বন বিভাগের তথ্যমতে, বালিজুরী রেঞ্জের ৮ হাজার ৩৩০ একর বনভূমিতে বর্তমানে প্রায় ১২০টি হাতি রয়েছে, যাদের জন্য বর্তমান বনাঞ্চল পর্যাপ্ত নয়। বালিজুরী রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়া জানিয়েছেন, হাতির খাদ্য সংকট নিরসনে ১১৫ হেক্টর এলাকায় বনায়ন ও কৃত্রিম জলাধার নির্মাণের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সংঘাত ও প্রাণহানি রোধে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
