লাতিন আমেরিকায় মাদকবিরোধী অভিযানের পরিধি বাড়াল যুক্তরাষ্ট্র, আইসিসিকে বয়কটের আহ্বান হেগসেথের

লাতিন আমেরিকায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করার অঙ্গীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। পানামায় এক বক্তৃতায় তিনি ঘোষণা করেন, কলম্বিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ বা ‘আমেরিকাস কাউন্টার কার্টেল কোয়ালিশন’ নামে পরিচিত আঞ্চলিক সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জোটের সদস্য দেশের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯-এ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মাদক চোরাকারবারিদের ‘নারকো-সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের দমনে কঠোর সামরিক কৌশল অবলম্বন করছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক কর্মকাণ্ডের তদন্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, এই কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ আইনানুগ এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের বিধি মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। আইসিসির বিচারিক এখতিয়ারকে ‘বেআইনি ক্ষমতা দখলের চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি জোটভুক্ত সব দেশকে এই আদালতকে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, এই সামরিক অভিযান কার্যত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শামিল। ওয়াশিংটন অফিস অন ল্যাটিন আমেরিকার জুলাই মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে শুরু হওয়া মার্কিন হামলায় অন্তত ২২১ জন নিহত হয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, এসব হামলায় জেলে, যাত্রী এবং মানবপাচারের শিকার সাধারণ বেসামরিক ব্যক্তিরাও প্রাণ হারিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
অভিযানের সাফল্যের দাবি করে হেগসেথ জানান, পশ্চিমা গোলার্ধের প্রধান সমুদ্রপথগুলোতে মাদকবাহী নৌযানের চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তার দাবি অনুযায়ী, পশ্চিম ক্যারিবীয় অঞ্চলে ৬৫ শতাংশ, পূর্ব ক্যারিবীয় অঞ্চলে ৬০ শতাংশ এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৫০ শতাংশ মাদক পরিবহন হ্রাস পেয়েছে। পেন্টাগন প্রধানের দাবি, এই সামরিক তৎপরতা নারকো-সন্ত্রাসীদের কোণঠাসা করে ফেলেছে।
এদিকে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে কট্টর ডানপন্থী নেতাদের উত্থানের সাথে এই সামরিক অভিযানের গভীর যোগসূত্র দৃশ্যমান। কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলান্দো দে লা এসপ্রিয়া দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মাদকবিরোধী ‘সর্বাত্মক যুদ্ধের’ ঘোষণা দিয়েছেন এবং মার্কিন সহায়তা চেয়েছেন। এছাড়া হন্ডুরাস ও গুয়াতেমালাও মার্কিন যৌথ অভিযানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো এবং ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজসহ বেশ কিছু রাষ্ট্রপ্রধান ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা গোলার্ধের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন ১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’-এর আদলে নতুন এক কৌশল প্রয়োগ করছে, যা ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারকদের কাছে ‘ডনরো ডকট্রিন’ হিসেবে পরিচিত। একদিকে সামরিক শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর বিরোধিতা—সব মিলিয়ে লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মানচিত্রে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
