দেশভাগের স্মৃতি ও হারানো প্রেমের আখ্যান নিয়ে ইমতিয়াজ আলীর ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা

নব্বই বছর পেরিয়ে পঞ্চান্নতে পদার্পণ করা ইশার সিং গ্রেওয়ালের শরীরী অস্তিত্ব এখন কেবল একটি ক্লান্ত পরিসর। বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়া মন তার ক্রমাগত অতীতে ডুবছে। স্মৃতিভ্রমের গোলকধাঁধায় হারিয়ে তিনি সারাক্ষণ বিড়বিড় করেন এক অমোঘ প্রতিজ্ঞার কথা—‘আমাকে ফিরতেই হবে, কিছু কাজ এখনো বাকি।’ লন্ডনের প্রবাস জীবন থেকে ফিরে আসা নাতি নিভি, অর্থাৎ দিলজিৎ দোসাঞ্জ, দাদার এই অসংলগ্ন প্রলাপের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়। ইমতিয়াজ আলীর নতুন চলচ্চিত্র ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ যেন সেই দীর্ঘশ্বাস আর ৭৮ বছর আগের এক অসমাপ্ত প্রেমের মহাকাব্যিক বয়ান।
সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে দেশভাগের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের দগদগে ক্ষত আর কিশোর কিনুর নিষ্পাপ প্রেমের সূক্ষ্ম বুনন বুনেছেন নির্মাতা। তরুণ কিনু—যিনি আজকের ইশার সিং—আফসানা নামের এক মুসলিম তরুণীর প্রেমে পড়েছিলেন। দেশভাগের নির্মম র্যাডক্লিফ লাইন যখন দুই সীমানার মাঝখানে দেয়াল তুলে দিল, তখন সেই কিশোরের কণ্ঠে ঝরেছিল প্রতিশ্রুতি, ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’। সেই প্রতিশ্রুতিই পরবর্তী জীবনে ইশার সিংয়ের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, যা তিনি দীর্ঘ সাত দশকের অধিক সময় ধরে নিজের বুকের গহীনে বন্দি করে রেখেছিলেন।
সিনেমার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন কিংবদন্তি নাসিরউদ্দিন শাহ। শিখ বৃদ্ধের চরিত্রে তাঁর অভিনয় যেন এক জাদুকরী অভিজ্ঞতা। স্মৃতি ও বিস্মৃতির দোলাচলে দোদুল্যমান একজন মানুষের যন্ত্রণা, বিরহ আর শেষ বয়সের আর্তি তিনি যেভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তা দর্শকদের হৃদয় নিংড়ে চোখের জল ফেলতে বাধ্য করে। তাঁর চোখের চাহনি যেন সিনেমার পর্দা ভেদ করে সোজা দর্শকের আত্মায় আঘাত করে। অন্যদিকে, দিলজিৎ দোসাঞ্জ নাতির চরিত্রে নিজেকে আবারও প্রমাণ করেছেন অত্যন্ত পরিপক্ব ও সংবেদনশীল অভিনেতা হিসেবে।
আফসানার চরিত্রে শর্বরী বাগ ও তরুণ কিনু চরিত্রে বেদাং রায়নার রসায়ন সিনেমার অতীত অংশকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। তবে এই সিনেমার আসল জাদুকর সম্পাদক আরতি বাজাজ। অতীত ও বর্তমানের যে নিরবচ্ছিন্ন মেলবন্ধন তিনি তৈরি করেছেন, তা ইমতিয়াজ আলীর পরিচালনার মুন্সিয়ানা আর এ আর রাহমানের সুরের মূর্ছনার সাথে মিলে এক মায়াবী আবেশ তৈরি করেছে। সংগীতের আবহ যেন পাঞ্জাবের রুক্ষ ধুলো আর হারানো প্রেমের দীর্ঘশ্বাসকে মিশিয়ে এক অপার্থিব বাতাবরণ সৃষ্টি করে।
‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়, বরং এটি দেশভাগের ট্র্যাজেডিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার এক সাহসী প্রচেষ্টা। এখানে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে খলনায়ক হিসেবে দাঁড় করানো হয়নি, বরং সহিংসতার উন্মত্ততাকে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। ইমতিয়াজ আলী প্রশ্ন তুলেছেন—আমরা কি আমাদের পূর্বপুরুষের ক্ষতকে ভুলে গিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সুস্থ থাকতে পারি? নাকি সেই না বলা বেদনা অন্য কোনো রূপে বারবার ফিরে আসে আমাদের তাড়া করতে? সিনেমাটি সেই চিরন্তন সত্যটিই মনে করিয়ে দেয় যে, ভালোবাসা হারিয়ে যেতে পারে না, বরং তা সময়ের ভাঁজে ভাঁজে জমা থাকে, অপেক্ষা করে এক ‘ফিরে আসার’ অপেক্ষায়।
