একাকিত্ব ও আত্মসংগ্রামের আখ্যানে স্পাইডার ম্যান ব্র্যান্ড নিউ ডে যেন প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দোলাচল

মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের বিশালাকার মাল্টিভার্স এবং পৃথিবী ধ্বংসের মহাকাব্যিক আখ্যান থেকে সরে এসে এবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরেছে এক অন্যরকম পিটার পার্কার। ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ মুক্তি পাওয়ার মাত্র ১০ দিনেই বিশ্বজুড়ে ১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের আকাশচুম্বী আয় করে বক্স অফিসে রীতিমতো রাজত্ব করছে। বাংলাদেশের সিনেপ্রেমীদের কাছেও সিনেমাটি নিয়ে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব উন্মাদনা, যা মুক্তির পর থেকে টানা এক সপ্তাহ টিকিট কাউন্টারগুলোতে ‘সোল্ড আউট’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে।
‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’-এর সেই হৃদয়বিদারক পরিণতির পর পিটার পার্কার এখন একাকী। ডক্টর স্ট্রেঞ্জের জাদুর ফলে পৃথিবী থেকে মুছে গেছে পিটারের অস্তিত্ব; তার প্রাণের বন্ধু নেড কিংবা প্রেমিকা এমজে—কেউই আজ আর তাকে চেনে না। টম হল্যান্ড অভিনীত এই নতুন পর্বে পিটারকে দেখা গেছে নিউইয়র্কের পথেঘাটে অপরাধ দমনকারী এক নিঃসঙ্গ যোদ্ধা হিসেবে। দিনের বেলা স্পাইডার-ম্যান হিসেবে মানুষের ভালোবাসা পেলেও, রাতের অন্ধকারে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রিনে প্রিয়জনদের জীবনের দিকে তাকিয়ে থাকা একাকিত্বই এখন তার নিত্যসঙ্গী।
সিনেমার গল্পে নতুন মোড় আসে যখন পিটারের শরীরে দেখা দেয় অস্বাভাবিক সব পরিবর্তন। নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করা স্পাইডার-ক্ষমতা এবং রহস্যময় মানসিক যন্ত্রণার গভীরে যেতে গিয়ে পিটার মুখোমুখি হয় এমন এক শত্রুর, যে মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। টম হল্যান্ড এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত, তার চোখেমুখে মিশে আছে ব্যক্তিগত জীবনের গ্লানি ও দায়িত্ববোধের দ্বন্দ্ব। জেনডায়ার স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় এবং জ্যাকব ব্যাটালনের চিরচেনা হাসিখুশি উপস্থিতি সিনেমার আবেগীয় ভারসাম্য বজায় রেখেছে। এছাড়া খলচরিত্রে স্যাডি সিঙ্ক এবং পরামর্শদাতা হিসেবে মার্ক রুফালোর উপস্থিতি গল্পের গভীরতা বাড়িয়েছে কয়েক গুণ।
পরিচালক ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্র্যাটন এবার বৃহদাকার কোনো বিশ্বসংকটের চেয়ে পিটারের ব্যক্তিগত মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনকে ফোকাস করেছেন। চিত্রগ্রাহক ব্রেট পাওলাকের ফ্রেমে নিউইয়র্কের আকাশচুম্বী দালান আর স্পাইডার-ম্যানের দোল খাওয়ার দৃশ্যগুলো কমিক বুকের পাতা থেকে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মাইকেল জ্যাকিয়ানোর আবহসংগীত পিটারের একাকিত্ব ও অস্থিরতাকে দিয়েছে এক অন্যমাত্রা। মার্শাল আর্ট কোরিওগ্রাফির অনবদ্য কারসাজি অ্যাকশন দৃশ্যগুলোকে প্রাণবন্ত করলেও, গল্পে কিছুটা সমন্বয়হীনতা এবং ভবিষ্যতের সিনেমার জন্য ইঙ্গিত দেওয়ার প্রবণতা মূল আখ্যানের আবেগকে মাঝে মাঝে বাধাগ্রস্ত করেছে।
সব মিলিয়ে ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ অ্যাকশন, আবেগ এবং ভিজ্যুয়াল নান্দনিকতার এক সুন্দর মিশেল। যদিও সিনেমাটি প্রত্যাশার তুলনায় খুব বেশি উদ্ভাবনী বা ‘ব্র্যান্ড নিউ’ হয়ে উঠতে পারেনি, তবুও পিটার পার্কারের নতুন এই যাত্রা ভক্তদের হৃদয়ে এক গভীর ছাপ রেখে যাবে। মার্ভেল ইউনিভার্সের গতানুগতিক ছক ভেঙে ব্যক্তিগত গল্পের কাছাকাছি আসার এই প্রচেষ্টা দর্শক মহলে নতুন করে স্পাইডার-ম্যানের আবেদনকে সতেজ করে তুলেছে।
